প্রজাপতি, অপূর্ব সুন্দর এক পতঙ্গ! বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই এর দেখা মেলে। বন-বাদাড়, মাঠ-ঘাট, বাগান—যেখানে ফুল আছে, সেখানেই প্রজাপতির আনাগোনা। শীত-বসন্তে ফুলের বাগানে, সবুজ শস্যখেতে যেন প্রজাপতির মেলা বসে। এসব প্রজাপতির আবার নানা ধরন, নানা বরণ, নানা আকার-আকৃতি।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে। পৃথিবীর নানা অঞ্চলেই আবার দেখা যায় নানা ধরনের প্রজাপতি। প্রজাপতির প্রজাতির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। পুরোনো একটি বহুল ব্যবহৃত হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ প্রজাতির প্রজাপতি ও স্কিপার রয়েছে।
দিবাচর প্রাণী হওয়ায় প্রজাপতি সহজেই মানুষের নজর কাড়ে। ধরতে গেলে এ পতঙ্গের প্রেমেই পড়ে যায় প্রকৃতিপ্রেমীরা।
প্রজাপতিকে নিয়ে সারা বিশ্বে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান, গল্প ও কবিতা। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও প্রজাপতিকে নিয়ে লিখেছেন—
‘প্রজাপতি! প্রজাপতি!
কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা,
টুকটুকে লাল-নীল ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা।’
আর প্রখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরীর সুরে বিশ্বখ্যাত শিল্পী লতা মঙ্গেশকর গেয়েছেন—
‘ও প্রজাপতি প্রজাপতি পাখনা মেলো
আমার এ মনের আঁধার কোণে কোণে-
রঙে রঙে রঙ মশাল জ্বালো।’
প্রজাপতির আচরণ নিয়ে লেখক ও কবি মার্গারেট রোজ লিখেছেন—
‘আমার চেনা ছোট্ট প্রজাপতিটির ছোট্ট সোনার ডানা,
ফুলের মাঝে খেলে আর দোলে, থামতে যেন মানা
পাপড়ির ওপর বসে বসে নাচে আর ফুলের মধু খায়
তারপর সে ডানা মেলে নেচে নেচে উড়ে চলে যায়।’
পৃথিবীর বড় আকারের প্রজাপতিগুলোর একটি মোনার্ক। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘ড্যানায়াস প্লেক্সিপাস’। অঞ্চলভেদে এর বিভিন্ন প্রচলিত নাম রয়েছে। মিল্কউইড গাছের ওপর শূককীটের নির্ভরতার কারণে একে ‘মিল্কউইড বাটারফ্লাই’ বলা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় এটি ‘ওয়ান্ডারার বাটারফ্লাই’ নামেও পরিচিত।
১৮৭৪ সালে মার্কিন কীটতত্ত্ববিদ স্যামুয়েল হাবার্ড স্ক্যাডার এ প্রজাপতির জন্য ‘মোনার্ক’ নামটি প্রস্তাব করেন। এরপর নামটি ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কালো, কমলা ও সাদা রঙের মিশ্রণে মোনার্ককে সহজেই চেনা যায়। উত্তর আমেরিকার মোনার্কদের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী প্রতি বছর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার উত্তরাঞ্চল থেকে শরৎকালে তারা দক্ষিণে, মেক্সিকোর মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ি বনাঞ্চলের দিকে উড়তে শুরু করে। এই যাত্রার দূরত্ব ৩ হাজার মাইলেরও বেশি হতে পারে এবং সময় লাগে দুই মাসের বেশি।
মেক্সিকোর পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে মোনার্করা শীতকাল কাটায় ওয়ামেল বা ওয়ামেল ফারগাছের বনে। সেখানে লাখ লাখ প্রজাপতি গাছের ডালে ও কাণ্ডে গুচ্ছ হয়ে থাকে।
মোনার্কের পরিযানের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো উত্তর আমেরিকা থেকে মেক্সিকো এবং মেক্সিকো থেকে কানাডা পর্যন্ত পুরো যাত্রা একটি প্রজাপতির জীবদ্দশায় সম্পন্ন হয় না।
সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক মোনার্ক দুই থেকে পাঁচ সপ্তাহের মতো বাঁচে। কিন্তু বছরের শেষ দিকে জন্ম নেওয়া পরিযায়ী প্রজন্ম অনেক বেশি দিন বাঁচতে পারে—প্রায় ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত।
শীত শেষে মেক্সিকো থেকে বেঁচে থাকা মোনার্করা উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে। পথে তারা মিলিত হয়, ডিম পাড়ে এবং কিছুদিন পর মারা যায়। তাদের ডিম থেকে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম আবার উত্তর দিকে এগিয়ে যায়। এভাবে এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম জন্ম নিতে নিতে মোনার্করা যুক্তরাষ্ট্রের আরও উত্তরে এবং কানাডার দিকে পৌঁছে যায়। সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মের এই উত্তরমুখী যাত্রায় কয়েকটি প্রজন্মের প্রয়োজন হয়।
এরপর গ্রীষ্মের শেষ দিকে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম আবার দক্ষিণমুখী যাত্রা শুরু করে। এই প্রজাপতিরাই কয়েক হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে মেক্সিকোর শীতকালীন আবাসস্থলে ফিরে যায়। অর্থাৎ যে মোনার্ক মেক্সিকো থেকে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করেছিল, তার সন্তান, নাতি বা পরবর্তী প্রজন্মের প্রজাপতিরাই শেষ পর্যন্ত কানাডায় পৌঁছায়। আবার কানাডা থেকে মেক্সিকো ফেরার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় নতুন একটি দীর্ঘজীবী প্রজন্ম।
হয়তোবা এ অনুভূতি নিয়েই কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ১৮০১ সালে ‘টু আ বাটারফ্লাই’ কবিতায় লিখেছেন—
`আমার কাছেই থাকো-পালিয়ে যেও না।
আরও কিছুক্ষণ থাকো আমার দৃষ্টির সীমায়
তোমার মধ্যে খুঁজে পাই অনেক কথোপকথন,
তুমি আমার শৈশবের ইতিহাসবিদ।’
আমি প্রজাপতির ইতিহাস পড়তে গিয়ে মোনার্ক প্রজাপতি সম্পর্কে অনেক অবাক করা তথ্য জেনেছি। ওয়াশিংটনে থাকাকালে একদিন একটি পার্কে গিয়ে এদের দেখেও এসেছি।
ছোটবেলা শীতকালে নোয়াখালী জেলার উপকূলীয় এলাকায়, দক্ষিণ জলস্করা গ্রামে আমাদের বাড়িতে গাঁদা ফুলের বাগানে প্রজাপতি দেখতাম। তখন কারও গায়ে প্রজাপতি এসে বসলে অন্যেরা এ নিয়ে কৌতুক করে বলতো, বিয়ে বা প্রেমের বার্তা এসেছে।
মোনার্ক প্রজাপতির ডানার বিস্তার চার ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। উড়ন্ত অবস্থায় প্রতি সেকেন্ডে কয়েকবার ডানা ঝাপটায়। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক মোনার্ক দুই থেকে পাঁচ সপ্তাহ বাঁচে। তবে শীতকাল পার করা দীর্ঘজীবী পরিযায়ী প্রজন্ম ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
উড়ন্ত অবস্থায় দ্রুত ডানা ঝাপটানোর কারণে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন এরা বাতাসে নেচে বেড়াচ্ছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলা যায়—
‘তারা কেবলই হাসে কেবলই গায়
হাসিয়া খেলিয়া মরিতে চায়।
না জানে বেদন, না জানে রোদন
না জানে সাধের যাতনা যতন।’
আমি ফিলিপাইনের মাকাতি সিটিতে অবস্থিত একটি চিড়িয়াখানায় মোনার্কের মতো দেখতে প্রজাপতি দেখেছিলাম। কিন্তু আমাদের সঙ্গে থাকা ফিলিপাইনের এক পরিবেশবাদী সংগঠনের কর্মী বলেছিলেন, সেখানে বিদেশি প্রজাতি রাখা হয় না; স্থানীয় প্রজাতিগুলো সংরক্ষণের জন্যই ওই উদ্যোগ।
বিশ্বব্যাপী বিহার করার সময়ে পথভ্রষ্ট কিংবা অভিমানী কোনো মোনার্ক এসব দেশেও এসে ঘর বাঁধে কিনা, তা আমার জানা হলো না।
আশঙ্কার কথা, উত্তর আমেরিকার পরিযায়ী মোনার্কের সংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে কমছে। তাদের জীবনচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মিল্কউইড ও ফুলের গাছ কমে যাওয়া, কৃষিজমিতে কীটনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার, নগরায়ন, আবাসস্থল ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তন—সবই এদের জন্য হুমকি তৈরি করছে। শীতকালীন আবাসস্থলের বন ধ্বংসও বড় উদ্বেগের বিষয়।
আশার কথা, ইতোমধ্যে মোনার্ক প্রজাপতিকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মেক্সিকোতে এদের জন্য নিরাপদ বনাঞ্চল তৈরি করা হয়েছে। ওয়াইল্ড লাইফ ফেডারেশনের ‘মোনার্ক প্রজাপতি সংরক্ষণ কর্মসূচি’র আওতায় আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর প্রায় ১ হাজার ২০০ শহরে সচেতনতা বাড়ানোসহ নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমেরিকান কংগ্রেসকে ‘মোনার্ক অ্যাক্ট অব ২০২৫’ অনুমোদনের জন্য আহ্বান জানানো।
আমাদেরকেও সব ধরনের প্রজাপতি রক্ষার জন্য উদ্যোগী হতে হবে। সারা দেশে জনমত গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা বিকাশ কার্যক্রম, প্রাণীকুলের জন্য পর্যাপ্ত অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে।
সবশেষে আমেরিকান কবি জোনাথন লেকউড হুইয়ের কবিতা থেকে বলি—
`ঈশ্বরকে চিনতে হলে,
একটা প্রজাপতিকে দেখুন—
এক বছর পর এবং হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে
কীভাবে সে আবার ফিরে আসে ঠিক সেই একই গাছে।’
