চোরাবালিতে আটকে আছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, ক্ষমতার পরিবর্তন এবং বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরও জটিল হয়ে পড়ছে—এমনটি বলছেন বিশ্লেষকেরা।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। তবে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে নৃশংস দমন-পীড়নের ফলে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেবল নেপিদোর (মিয়ানমারের রাজধানী) সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আরাকান আর্মির উত্থান, যারা বর্তমানে রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, এই সংকটে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে, পাশাপাশি রাখাইন থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের আসা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ব ব্যস্ত থাকায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ এবং মানবিক সহায়তার তহবিল হ্রাস পেয়েছে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের পরিচালক অধ্যাপক তৌফিক এম হক বলেন, ‘প্রত্যাবাসন প্রকৃতপক্ষে আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়েছে। যদি আমরা ২০১৭-২০১৮ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করি, তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি জটিল।’

তিনি বলেন, প্রধান অন্তরায়টি এখনো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা রাখাইনের বর্তমান বাসিন্দাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ—কাউকেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সহজতর করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।

আরাকান আর্মিও তাদের (রোহিঙ্গাদের) প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়ও, তবে যেকোনো টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা আলোচনার প্রয়োজন হবে।’

‘২০১৭ সালে বাংলাদেশ কেবল একটি পক্ষের সাথে আলোচনা করেছিল। এখন নেপিদো এবং আরাকান—উভয় পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনার প্রয়োজন।’

প্রচেষ্টা আছে, কিন্তু প্রত্যাবর্তন নেই

২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলের পর বাংলাদেশ দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় কাঠামো তৈরিতে পদক্ষেপ নেয়।

ওই বছরের ২৩ নভেম্বর দুই দেশ রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে একটি সমঝোতায় স্বাক্ষর করে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ইউএনএইচসিআরের সঙ্গেও একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। কিন্তু নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, সম্পত্তি এবং অধিকারের নিশ্চয়তা না থাকার কারণ দেখিয়ে রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি না হওয়ায় ওই বছরের নভেম্বরে প্রত্যাবাসনের প্রথম প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়।

২০১৯ সালের আগস্টে দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

পরে চীন একটি সমাধান খুঁজতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত হয়, কিন্তু কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট বিঘ্নতায় এই ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া থমকে যায় এবং ২০২১ সালের শুরুতে এটি পুনরায় সচল হয়। এরইমধ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত পরিস্থিতিকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে, যা দেশটিকে আরও গভীর সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াই তীব্রতর হয়। এতে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়।

মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ এখন দেশের বিশাল অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে জান্তা সমর্থিত প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং চলতি বছরের নির্বাচনের পর তার রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার পদক্ষেপ নিয়েছেন।

গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির তালিকার মধ্যে তারা চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫২৫ জনের পরিচয় যাচাই করেছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।

মিয়ানমার আরও জানায়, প্রত্যাবাসন শুরুর আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হতে হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে মিয়ানমারে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান মনে করেন, নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি না করে এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার আসলে কোনো মানে নেই।

তিনি বলেন, ‘সত্য কথা হলো, প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে একটি নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই যাচাইকরণ সম্পূর্ণ অনর্থক ও অর্থহীন।’

তিনি উল্লেখ করেন, যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছে মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ, যেখানে রাখাইনের বেশিরভাগ অংশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে।

তিনি বলেন, ‘এই পুরো যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি একটি ডাহা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।’

ইস্যুটি আর কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়

২০১৭ সালের নৃশংসতার পর রোহিঙ্গা সংকট যে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেয়েছিল, তা এখন ম্লান হয়ে গেছে।

সুফিউর এই পরিস্থিতিকে একটি আন্তর্জাতিক ‘মনোযোগের ঘাটতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ গাজা, ইউক্রেন, সিরিয়া ও অন্যান্য স্থানে উত্তেজনা রোহিঙ্গা সংকটকে কিছুটা আড়াল করে দিয়েছে।

অধ্যাপক তৌফিক এম হক বলেন, ২০১৭ সালের ঠিক পরেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্যাপক আন্তর্জাতিক ঐক্য ছিল। কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করার ফলে সেই ঐক্য এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটে এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আমরা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যেতে দেখছি। এই সব মিলিয়ে একটি মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’

এরইমধ্যে, ভারত ও চীন রাখাইনে তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ তৈরি করেছে।

ভারত তার কালাদান প্রকল্প নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। অন্যদিকে চীন চউকফিউ থেকে কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের পাইপলাইনের স্বার্থে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ বোঝা বহন করা সত্ত্বেও বাংলাদেশের হাতে প্রভাব খাটানোর মতো সুযোগ বা সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম।

যদিও বিএনপি সরকার বলেছে যে তারা মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মি উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষা করবে, তবে বাস্তবে তারা কী করছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

আসিয়ানের পাঁচ দফা ঐকমত্য কোনো অর্থপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে সুফিউর বলেন, কিছু আঞ্চলিক দেশ মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকার সামনে কঠিন বিকল্প

তৌফিক বলেন, বর্তমানের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ আর কেবল মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

আরাকান আর্মিকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে হয়তো এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভারত ও চীন যদি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে, তবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও আর্থ-সামাজিক ঝুঁকি বহন করা বাংলাদেশ কেন এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে?

তবে তৌফিক সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশকে খুব সাবধানে এগোতে হবে এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া এড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। মিয়ানমারের তৈরি করা বয়ান বা ন্যারেটিভকে সঠিকভাবে খণ্ডন করা এবং ভারত, চীন ও আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর কাজ এখনো বাকি।’

সরকারি সংস্থা, রাজনৈতিক দল, জাতীয় অংশীজন এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে একটি আরও বিস্তৃত ও ‘সমন্বিত ব্যবস্থা’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সুফিউর রহমান।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা, অধিকার, জীবিকা, সম্পদ এবং নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা চায়; কিন্তু মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন এক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে আছে।

তাই একটি টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন হবে রোহিঙ্গাদের অধিকার পুনরুদ্ধার, সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া, ক্ষতিপূরণ প্রদান, অন্যায়ের দায় স্বীকার এবং পরিশেষে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনরেকত্রীকরণ।

তিনি আরও বলেন, ‘এর ফলে প্রত্যাবাসন বিষয়টি কেবল কিছু লোকের নামের তালিকার ওপর একমত হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়েছে।’

তৌফিক বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়। কিন্তু পরিশেষে, এই বোঝা প্রকৃতপক্ষে আমাদের কাঁধেই এসে পড়েছে।’

তিনি আরও যোগ করেন, বাংলাদেশ যদি এই ক্রমবর্ধমান জটিল ও বিভক্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সঠিকভাবে সামাল দিতে না পারে, তবে প্রত্যাবাসন হয়তো কেবল একটি কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থেকে যাবে।

Related Articles

Latest Posts