দেশে মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাওয়া নারী ও শিশু-কিশোরদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর বিপরীতে সরকারি নিরাময়কেন্দ্রগুলোতে তাদের চিকিৎসার সুযোগ একেবারেই সীমিত। সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে মোট ১৯৯টি শয্যার বড় অংশই পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে চিকিৎসাসেবা পেতে নারী ও শিশুদের দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে, অথবা বাধ্য হয়ে বেসরকারি কেন্দ্রের ব্যয়বহুল চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
মূল চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা এখনো পুরুষকেন্দ্রিক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা, চিকিৎসক ও কর্মীর ঘাটতি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসাসেবার অসম সুযোগ এবং চিকিৎসা শেষে আবার মাদকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পুনর্বাসন ও চিকিৎসা বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, সরকারি মাদক পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোতে মোট শয্যা মাত্র ১৯৯টি। অথচ বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে ৬ হাজার ১৯০টি শয্যা।
তার ভাষায়, এই সক্ষমতা ‘খুবই অপ্রতুল’। দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ মাদকনির্ভর বলে ধারণা করা হয়।
দেশের প্রধান সরকারি মাদক নিরাময়কেন্দ্র তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নারী ও শিশুদের জন্য বরাবরই সীমিত জায়গা ছিল। আগে এই কেন্দ্রে মোট ১২৪টি শয্যা ছিল। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ৯০টি, নারীদের জন্য ২৪টি এবং শিশুদের জন্য মাত্র ১০টি।
এখন কেন্দ্রটিকে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে রূপ দেওয়ার কাজ চলছে। তবে নির্মাণকাজ চলায় বর্তমানে সেখানে শুধু ২৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পুরুষ রোগীদেরও এখানে ভর্তি হতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
কেন্দ্রের বাইরে ৬৫ বছর বয়সী এক নারী তার ৩৫ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তাকে জানানো হয়েছিল, ছেলেকে ভর্তি হতে দুই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
ছেলেটি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এখানে ভর্তি হতে পারলে আমি আবার সুস্থ জীবনে ফিরতে পারব।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালের আগে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নারী ও শিশুদের চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা ছিল প্রায় নেই বললেই চলে।
২০১৬ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৯০ জনে। ২০১৮ সালে ১৭১, ২০১৯ সালে ৫৪৪ এবং ২০২০ সালে ১ হাজার ২৪২ জন নারী ও শিশু সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নেয়।
এরপর সংখ্যাটি ওঠানামা করেছে। ২০২৩ সালে ৯১৭ জন, ২০২৪ সালে ৭০৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৪৩৪ জন নারী ও শিশু সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছে।
তবে এই কমে যাওয়াকে চাহিদা কমে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে মোট চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যাও অনেক কমেছে।
২০২৪ সালে সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছিল ১৩ হাজার ২৪ জন। ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭ হাজার ১৫৯ জনে।
২০২৫ সালে চিকিৎসা নেওয়া ৪৩৪ জন নারী ও শিশুর মধ্যে মাত্র ১২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা পেয়েছে। একই সময়ে পুরুষ রোগীদের মধ্যে ১ হাজার ৯৫৫ জন ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক ব্যবহারকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ কিশোর-কিশোরী ও তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ওয়েসিস মাদকাসক্তি নিরাময় ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্রের মনোবিজ্ঞানী মো. আরিফুল হক বলেন, বন্ধুদের চাপ, কৌতূহল, মানসিক চাপ, পারিবারিক সংকট এবং অভিভাবকের দুর্বল নজরদারির কারণে কিশোর-কিশোরীরা মাদকে জড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, কেন শুরু করেছিল জানতে চাইলে অনেকেই বলে, বন্ধু, বড় ভাই বা নিজেদের দল তাদের প্রভাবিত করেছে।
তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের প্রধান পরামর্শক ডা. কাজী লুৎফুল কবির বলেন, কেন্দ্রটিতে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ ১৮টি। কিন্তু আছেন মাত্র চারজন। নার্সসহ অন্যান্য কর্মীরও ঘাটতি রয়েছে।
কেন্দ্রে রোগীদের বিনা মূল্যে খাবার ও ওষুধ দেওয়া হয়। চিকিৎসার মেয়াদ ২৮ দিন। এরপর এক বছর ধরে তাদের খোঁজখবর ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা।
অন্যদিকে বেসরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসার খরচ অনেক বেশি। কোন কেন্দ্র ও কী ধরনের সেবা নেওয়া হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে মাসে কয়েক হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
২০২৫ সালে সরকারি ও বেসরকারি, দুই ধরনের কেন্দ্র মিলিয়ে ৩৯ হাজার ৬৪১ জন মাদকনির্ভর মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ৭৬ জন।
তবে সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ১৩ হাজার ২৪ জন চিকিৎসা নিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭ হাজার ১৫৯ জনে।
অন্যদিকে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৪ সালে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ২৬ হাজার ৫২ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৪৮২ জনে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দেশের পুনর্বাসনসেবা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। বিশেষ করে বড় শহরের বাইরে এই সংকট বেশি।
এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ঢাকার বাইরে দেশের সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যার করে মাদকাসক্তি চিকিৎসাকেন্দ্র করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এতে নতুন করে ১ হাজার ৪০০ শয্যা যুক্ত হবে।
মাদকাসক্তির সমস্যা শুধু সরকারি কেন্দ্রের সীমিত শয্যার মধ্যেই আটকে নেই। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত কিশোরীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও গভীর।
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে আপন নিবাস মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে এখন ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পাচ্ছে। একসময় তার ঠিকানা ছিল রাস্তায়। এখন সে পড়াশোনা করছে, বুটিকের কাজ শিখছে। ভবিষ্যতে আবার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়।
প্রায় চার বছর ধরে সে এই কেন্দ্রে আছে। এর মধ্যে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করেছে এবং হাতের কাজও শিখেছে। এখন তাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করানোর চেষ্টা চলছে।
কিশোরীটি বলে, রাস্তায় খুব অসহায় জীবন কাটিয়েছি। শরীরে ময়লা লেগে থাকত, অনেক মানুষ আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত। এখন এখানে খাবার, পড়াশোনা আর প্রশিক্ষণ পাই। আমি বড় হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তাকে ভারতে পাচার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে নির্যাতনের শিকার হয় সে। পরে তাকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হলেও মাকে বা বোনকে আর খুঁজে পায়নি।
এরপর ঢাকার রাস্তায় থাকতে শুরু করে সে। সেখানে সস্তা আঠাজাতীয় পদার্থ ‘ড্যান্ডি’ ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে। পরে তাকে আপন কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।
আপনের প্রশিক্ষক, কাউন্সেলর ও উন্নয়নকর্মী খন্দকার আশাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, সিংগাইরের এই কেন্দ্রে বর্তমানে ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২৫ শিশুর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন চলছে। পাশাপাশি ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১২ কিশোরীও রয়েছে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রে আসা বেশির ভাগ শিশুই ড্যান্ডি বা আঠা শোঁকার নেশায় আসক্ত। কেউ কেউ গাঁজা ও ইয়াবাতেও আসক্ত।
এসব শিশুকে চিকিৎসার পাশাপাশি পড়াশোনা, কাউন্সেলিং ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের পরিবারের সন্ধান করারও চেষ্টা করা হয়।
সাধারণত পুনর্বাসন কার্যক্রম এক বছর চলে। তবে প্রয়োজন হলে সময় আরও বাড়ানো হয়। জুয়েল জানান, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০-এর বেশি শিশু ও নারীকে এই কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকাসক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি রোগ হিসেবে বিবেচনা করে চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন ও চিকিৎসা-পরবর্তী সহায়তা আরও জোরদার করা দরকার। কারণ চিকিৎসার পর আবার মাদকে ফিরে যাওয়া এখনো বড় সমস্যা।
ডা. কাজী লুৎফুল কবির বলেন, আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, চিকিৎসার পর প্রায় ৩৫ শতাংশ রোগী মাদক থেকে দূরে থাকতে পারেন। আর প্রায় ৬৫ শতাংশ আবার মাদকে ফিরে যান। বিশেষ করে আগের পরিবেশে বা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে ফিরে গেলে এই ঝুঁকি বেশি থাকে।
অর্থাৎ শুধু মাদক থেকে দূরে রাখলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর একজন মানুষ কী পরিবেশে ফিরছেন, কার সঙ্গে মিশছেন এবং পরিবার ও সমাজ থেকে কী ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নারী ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে সেই সহায়তার ঘাটতি আরও বড়। আর সরকারি পুনর্বাসনব্যবস্থা যদি তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলানো না যায়, তাহলে চিকিৎসা নিতে চাইলেও অনেকেই সেই সুযোগ থেকে দূরেই থেকে যাবেন।
