ফ্রান্স উপকূলে ৭০-এর দশকে গড়া ভবিষ্যতের শহর লা গ্রঁদ-মত

ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূলে এমন একটি শহর আছে, যেখানে পা রাখলেই মনে হতে পারে, সময়টা বুঝি কয়েক দশক এগিয়ে গেছে। আবার একটু ভালো করে তাকালে মনে হবে, আপনি আসলে ১৯৭০-এর দশকের কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ভবিষ্যৎ দুনিয়ায় এসে পড়েছেন।

শহরটির নাম লা গ্রঁদ-মত। ফ্রান্সের মনপেলিয়ের থেকে গাড়িতে প্রায় ৩০ মিনিটের পথ। ভূমধ্যসাগরের পাশে গড়ে ওঠা এই শহরের ভবনগুলো আর দশটা শহরের মতো নয়। কোথাও মায়া সভ্যতার পিরামিডের মতো আকৃতি, কোথাও বিশাল বাঁক, কোথাও আবার এমন নকশা যে ভবনটিকে দূর থেকে কাত হয়ে আছে বলে মনে হয়।

প্রায় ৬০ বছর আগে তৈরি এই শহরটি আসলে একসময়কার ভবিষ্যৎ-স্বপ্নের বাস্তব রূপ। ১৯৭০-এর দশকের স্থপতিরা ভবিষ্যতের পৃথিবীকে যেমন কল্পনা করেছিলেন, লা গ্রঁদ-মতের স্থাপত্যে তারই এক অদ্ভুত ছাপ দেখা যায়।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো সেই স্থাপত্য এখন আবার নতুন করে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

লা গ্রঁদ-মত কোনো প্রাচীন শহর নয়। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে ও ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ফরাসি সরকারের একটি বড় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শহরটির জন্ম।

তখন ফরাসিদের ছুটি কাটানোর অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য ছিল স্পেনের কোস্তা ব্রাভা। সেই প্রবণতা কমিয়ে দেশের দক্ষিণ উপকূলেই পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছিল ফরাসি সরকার।

মনপেলিয়ের থেকে পেরপিনিয়াঁ পর্যন্ত দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকার বড় একটি অংশ তখন অনুন্নত ছিল। জায়গাটির আরেক সমস্যা ছিল মশার উপদ্রব। সরকার সেই এলাকাকে বদলে দিয়ে ভূমধ্যসাগরের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কোট দাজুরের বিকল্প তৈরি করতে চেয়েছিল।

তাই উপকূলজুড়ে তৈরি হয় নতুন সৈকত ও কয়েকটি পরিকল্পিত শহর। এর মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে লা গ্রঁদ-মত।

শহরটির পরিকল্পনায় পর্যটন, স্থাপত্য ও প্রকৃতিকে একসঙ্গে রাখা হয়েছিল। একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে লবণাক্ত জলাভূমি। কাছেই আবার রয়েছে ১৩ শতকের প্রাচীরঘেরা শহর এগ-মর্ত।

গার্ডিয়ান জানায়, লা গ্রঁদ-মতের স্থাপত্যের মূল কারিগর ছিলেন ফরাসি স্থপতি জ্যাঁ বালাদুর।

প্রথম শতকের মন্দির থেকে শুরু করে মধ্য আমেরিকার প্রাচীন সভ্যতার পিরামিড, বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। তবে তার চোখ ছিল ভবিষ্যতের দিকে।

তার লক্ষ্য ছিল, ১৯৭০-এর দশকে দাঁড়িয়ে ২১ শতকের পৃথিবী কেমন হতে পারে, তার একটি স্থাপত্যিক কল্পনা তৈরি করা।

তাই এখানে আবাসিক ভবনও পিরামিডের মতো দেখতে। কোনো ভবন আবার বিশাল কোনো আন্তঃগ্রহীয় কাঠামোর মতো। সব মিলিয়ে শহরটিতে এমন এক জ্যামিতিক বৈচিত্র্য দেখা যায়, যা সাধারণ শহরের সঙ্গে মেলানো কঠিন।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরের ইনকাস ভবনের ছোট ছোট স্টুডিওগুলোতে থাকা যায়। ঘরের ভেতরের নকশায় হয়তো বিশেষ কিছু নেই, কিন্তু বারান্দায় দাঁড়ালেই মনে হয়, সময় যেন হঠাৎ কয়েক দশক পেছনে ফিরে গেছে।

এই অনুভূতিটিই সম্ভবত লা গ্রঁদ-মতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

লা গ্রঁদ-মতের প্রধান সৈকত পয়াঁ জেরোতে প্রথমবার গেলে খুব সাধারণ একটি সমুদ্রসৈকত বলেই মনে হতে পারে।

বালিতে খেলছে পরিবারগুলো। ক্যাফের বাইরে বসে আছেন পর্যটকেরা। ২০২৫ সালে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও পানির মানের জন্য সৈকতটি ব্লু ফ্ল্যাগ পুরস্কারও পেয়েছে।

কিন্তু একটু চোখ তুলে চারপাশে তাকালেই দৃশ্যটা বদলে যায়।

সৈকত ঘিরে থাকা ভবনগুলোর নকশায় আয়তাকার আকৃতি প্রায় নেই বললেই চলে। সোজা কোণও খুব কম। কোথাও বাঁক, কোথাও ঢাল, কোথাও স্তরে স্তরে বেরিয়ে থাকা বারান্দা। মনে হয়, কোনো এক কল্পিত গ্রহে মানুষের বসতি তৈরি হয়েছে।

শহরের পরিকল্পনাতেও গাড়ির চেয়ে মানুষ ও সাইকেলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। হাঁটার পথ ও সাইকেলপথের পাশে রয়েছে হাজার হাজার গাছ।

এমনকি শহরের ফেরিস হুইলও সৌরশক্তিতে চলে।

শহরের সৈকতে শিল্পী জোসেফিন শেভরির তৈরি বেশ কিছু কংক্রিটের ভাস্কর্য রয়েছে বলে জানিয়েছে গার্ডিয়ান।

দেখতে এগুলো অনেকটা ইংল্যান্ডের কেন্টের ডানজেনেসে থাকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার শব্দ শনাক্ত করার কাঠামোর মতো।

তবে এগুলো নিছক সৌন্দর্যের জন্য তৈরি হয়নি। শহর নির্মাণের সময় বালুর টিলা ধরে রাখা, বাতাসের গতি কমানো এবং ছায়া দেওয়ার জন্য এসব কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ কাঠামোই বালুর নিচে চাপা পড়ে গেছে। তবু শহরের মূল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এগুলোর গুরুত্ব এখনো রয়ে গেছে।

লা গ্রঁদ-মতের ভাগ্য অবশ্য সব সময় এতটা ভালো ছিল না।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে শহরটির আকর্ষণ অনেকটাই কমে যায়। অনেকের চোখে তখন এর স্থাপত্য ছিল সেকেলে, এমনকি রুচিহীনও।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচিও বদলেছে।

২০১৪ সালে ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার সিমন পোর্ত জাকমুস শহরটিকে ঘিরে নস্টালজিক একটি পোশাকের সংগ্রহ ও বই প্রকাশ করেন।

শহরটির একসময়কার ‘সস্তা রুচির’ বদনামের কথা বললেও জাকমুস একইসঙ্গে একে অনুপ্রেরণাদায়ক ও রোমাঞ্চকর বলে বর্ণনা করেছিলেন। শৈশবে তিনি এখানেই ছুটি কাটিয়েছেন।

এখন যেন নতুন প্রজন্মও শহরটিকে নতুন চোখে দেখছে।

যাদের বাবা-মা বা দাদা-দাদি একসময় এখানে অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছিলেন, তাদের নাতি-নাতনিরাই আবার লা গ্রঁদ-মতকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন।

লা গ্রঁদ-মতে শুধু একটি ভবন দেখতে যাওয়ার শহর নয়। বরং এর আসল সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে পুরো শহরজুড়ে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাপার্টমেন্ট ভবনগুলোর মধ্যে ঘুরে বেড়ানো অনেকটা কলোসিয়াম দেখার মতোই আকর্ষণীয়।

খোলা আকাশের নিচে রয়েছে একটি থিয়েটার। দেখতে অনেকটা পরিত্যক্ত কোনো বিশ্বমেলার জায়গার মতো হলেও সেখানে নিয়মিত অনুষ্ঠান হয়।

আছে সাঁ-অগাস্তাঁ গির্জা। সাদা, ধনুকের মতো বাঁকানো এর আকৃতি শহরের অন্য স্থাপনাগুলোর সঙ্গেও যেন অদ্ভুতভাবে মিশে যায়।

সেখান থেকে পানিপথে এগোলেই দেখা যায় নৌকায় ভরা বন্দরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিগ পিরামিড আবাসিক কমপ্লেক্স। আর রয়েছে ল্য কুশাঁর নিচু ও বাঁকানো ভবনগুলো।

গার্ডিয়ান জানায়, পুরো শহরের নকশায় জার্মানির বাউহাউস শিল্পধারা, গ্রাফিক ডিজাইনার সল বাসের পোস্টার এবং ভার্নার পান্টনের আসবাবের ছাপ যেন একসঙ্গে মিশে আছে।

লা গ্রঁদ-মত আসলে ১৯৭০-এর দশকের একটি ভবিষ্যৎ-স্বপ্ন, যে ভবিষ্যৎ তখনকার মানুষ কল্পনা করেছিল।

সূর্যের আলোয় ঝকঝকে সাদা ভবন, বাঁকানো দেয়াল, অদ্ভুত সব পিরামিড আর সমুদ্রের পাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ, সব মিলিয়ে শহরটি যেন সেই স্বপ্নেরই একটি জীবন্ত স্মারক।

শুধু পার্থক্য হলো, সেই ভবিষ্যৎ এখন আর ভবিষ্যৎ নয়।

আমরা সেই সময় পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু লা গ্রঁদ-মত এখনো দাঁড়িয়ে আছে, ১৯৭০-এর দশকের চোখে দেখা এক ভবিষ্যৎ হয়ে।

হয়তো সেই কারণেই শহরটি এত আকর্ষণীয়। এটি  এমন একটি ভবিষ্যতের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা একসময় খুব কাছেই মনে হতো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি।

Related Articles

Latest Posts