প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে একটা ছবি ফিরে আসে টাইমলাইনে—মাথায় ব্যান্ডানা টাইপ রুমাল, চোখে গোল সানগ্লাস, হাসিমুখের এক তরুণ, চিরকালের ২৪ বছর বয়সী। বেঁচে ছিলেন যত বছর, তারচেয়ে বেশি সময় ধরে তিনি মৃত। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ার, তারপর প্রায় তিন দশকের অনুপস্থিতি। তারপরও ২০২৬ সালে এসেও বাংলাদেশ তাকে শুধু স্মরণ করছে না; আজও তিনি বহু তরুণের ফ্যাশন আইকন।
মাত্র ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করা একজন মানুষ মৃত্যুর তিন দশক পরও বিনোদন জগতের সবচেয়ে বড় খবরের মধ্যমণি! সিনেমার পর্দায় নায়ক বলতেই আপামর বাঙালি একবাক্যে যাকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটি দিয়ে দেয়, নিঃসন্দেহে তিনি সালমান শাহ। তিনি যেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
এই কথাগুলোই থমকে ভাবার মতো। বাংলাদেশে জনপ্রিয় তারকা অনেকেই রয়েছেন—সালমান শাহের মৃত্যুর আগেও ছিলেন, পরেও ছিলেন এবং আছেন। কিন্তু কেউ সালমান শাহের মতো এমন জায়গা তৈরি করতে পারেননি—কিশোরী-তরুণীদের কাছে তিনি প্রেমিক, নায়ক; কিশোর-তরুণদের কাছে ফ্যাশন আইকন।
নব্বই দশকের বাংলাদেশের সিনেমার দর্শকের মনে একটি প্রশ্ন এখনো ঘুরপাক খায়—নতুন নায়ক আসে, সিনেমার মাধ্যম বদলায়, দর্শকের দেখার অভ্যাস বদলায়, কিন্তু কেন সালমান শাহের মতো জনপ্রিয় আর কেউ হয়ে উঠতে পারলেন না?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু তার সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করলে হবে না, বরং তার তৈরি করে যাওয়া ‘হিরো’ ধারণাটির দিকে তাকাতে হবে। সালমান শাহ চলে যাওয়ার বহু বছর পরও ঢালিউডের সিনেমা বারবার সেই মুখ, সেই পোশাক, সেই রোমান্টিক নায়ক সত্তা, সেই অকাল প্রয়াণের মিথের কাছে ফিরে আসে। কখনো সরাসরি স্মৃতিতে, কখনো চরিত্রে, কখনো গল্পের ভেতরের এক অদৃশ্য উপস্থিতিতে।
এর একটি চমৎকার উদাহরণ ‘পোড়ামন ২’। ২০১৮ সালের এই সিনেমায় সিয়াম আহমেদের চরিত্র ‘সুজন শাহ’ সালমান শাহের অন্ধভক্ত। সে নিজেও নায়ক হতে চায়। এমনকি ‘শাহ’ পদবিটিও সালমান শাহকে শ্রদ্ধা জানাতেই রাখা হয়েছিল বলে সিয়াম জানিয়েছিলেন। আর পরিচালক রায়হান রাফি নিজেও সালমানের একনিষ্ঠ ভক্ত। এক আলাপে তিনি জানিয়েছিলেন, গল্পের মূল চরিত্রকে যখন একজন মহাতারকার ভক্ত হিসেবে ভাবা হয়, তখন সালমান শাহের নামই সবার আগে আসে।
অর্থাৎ, ‘পোড়ামন ২’ শুধু একজন সালমান ভক্তের গল্প নয়; সালমান শাহ কীভাবে অভিনেতা থেকে একটি সাংস্কৃতিক আদর্শে পরিণত হয়েছেন তার বিশ্লেষণধর্মী নিরীক্ষা যেন। অন্যভাবে বললে, সালমান শাহের অভিনেতা সত্তার বেশ খানিকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থেকেছে ‘পোড়ামন ২’। যে নায়ককে অনুকরণ করতে চায় পরবর্তী প্রজন্মের এক তরুণ, যে নায়কের পোশাক, চুল, স্টাইল নতুন সিনেমার গানে আবার পর্দায় ফিরে আসে এবং যে নায়ককে কেন্দ্র করে প্রায় তিন দশক পরেও নতুন গল্প লেখা যায়। এখানেই সালমান শাহের উত্তরাধিকার একেবারে ভিন্ন। তিনি নেই, কিন্তু তার তৈরি করা নায়কের চেহারা, শরীরী ভাষা, ফ্যাশন ও প্রেমের ভাষা বারবার ফিরে আসে।
সালমান শাহ নামটি তার নিজের নয়। পারিবারিকভাবে তার নাম রাখা হয়েছিল চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৯৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সুপারহিট চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক। এই ছবিতে অভিনয় করার সময়ই পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তার ‘স্ক্রিন নেম’ বা পর্দার নাম রাখলেন ‘সালমান শাহ’।
নায়কোচিত আলোর বলয় পেরিয়ে সালমান শাহ বা ব্যক্তি ইমন আসলে কেমন ছিলেন? কীভাবে চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন থেকে হয়ে উঠলেন সালমান শাহ—বাঙালির স্বপ্ন ও তারুণ্যের আইকন? মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে কী এমন ছাপ রেখে গিয়েছিলেন তিনি যে, ১৯৯৬ সালে পর্দা থেকে চিরতরে সরে যাওয়ার পরও প্রায় তিন দশক ধরে বাংলা সিনেমার দর্শকের স্মৃতিতে তার আসন অটল? পর্দায় তার অনুপস্থিতির ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও কেন নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি এখনো ‘নায়ক’? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ব্যক্তি ইমন এবং নির্মিত ‘সালমান শাহ’ এই দুই সত্তার মধ্যে দূরত্ব ও মিলের দিকে।
তার শুরুটা বাংলাদেশ টেলিভিশন দিয়ে। ‘আকাশ ছোঁয়া’, ‘পাথর সময়’-এর মতো নাটকে ছোট চরিত্র, মডেলিং, হানিফ সংকেতের একটা অনুষ্ঠানের মিউজিক ভিডিওতে আশির দশকের মাঝামাঝি প্রথম দেখা যায় তাকে। তখনো কেউ বোঝেনি, সামনে কী অপেক্ষা করছে। মোড় ঘুরল প্রায় দৈবক্রমে। সোহানুর রহমান সোহান তৈরি করছিলেন ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর বাংলা রিমেক। নায়িকা হিসেবে মৌসুমী ঠিক হয়ে গেছেন। নায়ক মিলছে না। একজনের সুপারিশে অডিশন দিলেন এমন এক তরুণ, পরবর্তীতে পরিচালক যার নাম রাখলেন সালমান শাহ। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তি পেল, সুপারহিট হলো। আর বছর শেষ হওয়ার আগেই নতুন এই মুখ হয়ে গেল ‘তারকা’।
এরপর টানা তিন বছর ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘তোমাকে চাই’সহ বিচিত্র সব ধারার সিনেমায় তিনি প্রধান চরিত্র। তিনটা ছবি ঢালিউডের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফলের তালিকায়। আর তখনকার বেশিরভাগ বিবরণ অনুযায়ী তিনিই তৎকালীন সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতা। এই ঘনত্বটাই সালমান শাহকে মাত্র তিন বছরে এতগুলো ধারায় টানা ব্যবসাসফলতা এবং একজন জনপ্রিয় নায়কের গল্প থেকে আলাদা করে দেয়।
তাকে নিয়ে যতই উন্মাদনা থাকুক না কেন, ব্যক্তি ইমন ভীষণ চঞ্চল ও আবেগি মানুষ ছিলেন। তার ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণে তেমনটাই শোনা যেত।
দর্শকনন্দিত জুটি সালমান-শাবনূর। শাবনূরের ভাষায়, সালমান ছিলেন ‘মাটির তারকা’, যার তারকাখ্যাতির আড়ালেও ছিল এক সহজ ও আপন মানুষ। সালমানের অসমাপ্ত কাজগুলো করতে গিয়ে শাবনূর একসময় বলেছিলেন, সালমানের স্মৃতি তাকে ক্ষতবিক্ষত করে; যেন প্রতিটি স্মৃতি একেকটি বেদনার পাহাড়। সেই বেদনা কেবল একজন সহশিল্পীকে হারানোর নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের এক অসম্ভব সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের আকস্মিক সমাপ্তিরও।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাই সালমান শাহ শুধু এক জনপ্রিয় নায়ক নন, তিনি এক ধূমকেতু। স্বল্প সময়ের জন্য আবির্ভূত হয়ে যিনি চলচ্চিত্রের আকাশকে এমনভাবে আলোকিত করেছিলেন যে, তার প্রস্থানেও সেই আলো নিভে যায়নি।
সালমান শাহের পর্দা-ব্যক্তিত্ব ছিল অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি—আটপৌরে, দর্শকেরই বয়সী মনে হতো। ‘সুজন সখী’তে গ্রামীণ চরিত্রের ভাষাভঙ্গি নিয়ে তার নিষ্ঠা প্রশংসিত হয়েছিল। অর্থাৎ চেনা গল্পে বসানো নিছক সুদর্শন মুখ তিনি ছিলেন না। গোল সানগ্লাস, জিনসের ওপর ঢিলেঢালা জ্যাকেট, কেয়ারলেস দৃষ্টি ও ব্যক্তিত্বের কারণে তরুণরা তাকে ফ্যাশন আইকন হিসেবে দেখতে শুরু করে। দর্শকরা তারকার স্টাইল নকল করে। কিন্তু তার ‘সিগনেচার লুক’, তরুণদের মাঝে তার চালচলন নকল করার গল্প আজও পত্রিকার পাতায় উঠে আসে।
নব্বইয়ে তার খ্যাতি ছিল সর্বব্যাপী। স্মরণ করতে হবে যে, তারকাখ্যাতির পথ তখন কত সংকীর্ণ ছিল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনো অ্যালগরিদম ছিল না। ছিল বিটিভি, সিনেমা হল, পত্রিকার গসিপ কলাম, দেয়ালে সাঁটা পোস্টার, অডিও ক্যাসেট আর রেডিও। তার সিনেমার গানগুলো, বিশেষত আগুনের কণ্ঠে গাওয়া দ্বৈতগুলো তরুণ-তরুণীদের মুখস্থ ছিল। তারকার ছবি ধীরে ভ্রমণ করত, খুঁজে নিতে হতো। তাই সেই সময়ের প্রতিটা সাক্ষাৎকার, একটা পোস্টার, একটা গান আজকের এক-লহমার ছবির স্রোতের চেয়ে বেশি ওজন বহন করত।
বিটিভিতে প্রথমে পরিচিতি, তারপর সিনেমায় তারকাখ্যাতি—এই দুই ধাপ পেরিয়ে আসা তার সেই রাতারাতি খ্যাতি এখনকার ইনস্টাগ্রামের যুগে বসে চিন্তা করা যায় না। খ্যাতির চূড়ায় থেকে মারা যাওয়া তারকাদের নিয়ে একটা সাধারণ পর্যবেক্ষণ আছে। মৃত্যু তার ছবিকে জমিয়ে রাখে, বয়স বাড়তে দেয় না। সালমান শাহকে কখনো বার্ধক্যের দিকে যেতে দেখা যায়নি। কখনো কঠিন কোনো ক্যারিয়ার পতনের মুখোমুখি হতে হয়নি। এমনকি পর্দায় মধ্যবয়সে মানিয়ে নিতে হয়নি—যেমনটা তার সমসাময়িকদের হয়েছে। মৃত্যুর সময় পাঁচটা ছবি অসমাপ্ত ছিল। পরে বডি ডাবল বা নতুন অভিনেতা দিয়ে সেগুলো শেষ করা হয়। একটা ক্যারিয়ার মাঝপথে থেমে যাওয়ার আক্ষরিক দৃষ্টান্ত তিনি। এটাই সম্ভবত তার ছবি এত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার একটা যুক্তিসংগত কারণ, যদিও অনুমাননির্ভর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন দর্শক সুযোগ পেল পুনরায় সালমান শাহকে দেখার-শোনার, সেই পুরোনো ছবি ছড়িয়ে দিয়ে প্রিয় তারকাকে স্মরণ করার, এখনো ফেসবুকে লাখো ভক্ত তার ছবি ও ক্লিপ পোস্ট করে চলেছেন। তার গান, বিশেষত শাবনূর ও মৌসুমীর সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠ ইউটিউব আর টিকটকে বারবার ফিরে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ চাহিদা অনুযায়ী মাঝেমধ্যে তার ছবির ডিজিটাইজড প্রিন্ট দেখায়, জন্মবার্ষিকী ঘিরে একটা বার্ষিক স্মরণ উৎসবও চালু আছে।
এখানে একটা প্রশ্ন ওঠে সালমান শাহকে উপলক্ষ করে। ইন্টারনেট-পূর্ব যুগের মিডিয়ায় গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া একজন তারকা কীভাবে ইনফ্লুয়েন্সার-প্রভাবিত দর্শকের কাছেও প্রাসঙ্গিক থাকেন? যারা আবার সেই তারকার চলচ্চিত্র মুক্তির সময় তার ছবি দেখার বয়সেও পৌঁছাননি? এক অংশের উত্তর হলো, ইন্টারজেনারেশনাল ট্রান্সমিশন বা প্রজন্মান্তরে চলাচল—যারা তাকে দেখে বড় হয়েছেন, তারা গান আর গল্প সন্তানদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এরপর তার প্রশ্ন উদ্রেককারী মৃত্যু ও হত্যা মামলা নতুন করে অ্যালগরিদমকে তাজা উপকরণ জুগিয়েছে।
সম্প্রতি তার মামলার কার্যক্রম এগিয়েছে। বলা যায়, এর মাধ্যমে সালমান শাহকে শুধু স্মরণ করা হচ্ছে না, তিনি এখনো আক্ষরিক অর্থেই তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে যা-ই বেরিয়ে আসুক, এই সত্য মুছবে না যে বাংলাদেশ প্রায় তিন দশক ধরে সালমান শাহের গল্পটা শেষ করতে পারেনি। আর সেটাই বিস্ময়করভাবে তাকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে—যেন সময়ের কাছে তার বয়স থেমে আছে চিরকাল।
আজ ৬ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যুবার্ষিকী। আসছে তার জন্মদিনও, ১৯ সেপ্টেম্বরে। যে সেপ্টেম্বরে তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন, সেই সেপ্টেম্বরেই মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি চলে যান। একই মাসে তার জন্ম ও মৃত্যুর অদ্ভুত এই সমাপতন যেন তার জীবনকে আরও বেশি কিংবদন্তির আবরণে ঢেকে দিয়েছে।
ফাতিমা আমিন: সহকারী অধ্যাপক, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; ফিল্ম ও নিউ মিডিয়া গবেষক
