পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একজন সুপরিচিত মুখ আবুল হায়াত। মঞ্চ থেকে টিভি, চলচ্চিত্র—সর্বক্ষেত্রেই এই একুশে পদকজয়ী গুণী অভিনেতা, নাট্যকার ও পরিচালক সবার নজর কেড়েছেন।
আজ সোমবার ৭ সেপ্টেম্বর আবুল হায়াতের ৮২তম জন্মদিন।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে জন্মদিন উপলক্ষে শিল্পীজীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
জন্মদিনে কী মনে হয়? জীবন ফুরিয়ে গেল—এমনটি মনে হয় কী?
জন্মদিনে মনে হয়, জীবন থেকে আরও একটি বছর শেষ হয়ে গেল এবং নতুন একটি বছর পেলাম। নতুন দিন পেলাম। নতুন ভোর পেলাম। নতুন আলো পেলাম। এত বছর বেঁচে থাকার জন্য সমস্ত কৃতজ্ঞতা জানাই সৃষ্টিকর্তার প্রতি। তিনি আমাকে জীবন দিয়েছেন এবং বাঁচিয়ে রেখেছেন। সৃষ্টিকর্তা যদি আয়ু দেন, তাহলে নতুন করে আবারও পরিকল্পনা করব এবং কিছু কাজ করতে পারব।
জীবন ফুরিয়ে গেল, তা তো মনেই হয়। কী করলাম এই জীবনে, কতটুকু দিতে পারলাম, কী কী কাজ করলাম, তাও মনে হয়।
শিল্পীর জীবন আপনার। এই জীবন সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কী?
শিল্পীর জীবন হচ্ছে সৃজনশীলতা। প্রতিদিন নতুন কিছু সৃষ্টি করা, নতুন নতুন চরিত্রে অভিনয় করা, নতুন গল্পের সঙ্গে মিশে যাওয়া। শিল্পীর জীবন আনন্দের। এখানে উত্থান-পতন আছে, আনন্দ আছে, সবই আছে। সময়ের অভাবে হয়তো একজন শিল্পী সব কাজ করতে পারেন না। কিন্তু চেষ্টা থেকে যায়।
কী করলাম, আরও কী চিন্তা করা যায়।
অসংখ্য নাটক-সিনেমায় অনেক রকম চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তারপরও অভিনয় নিয়ে আফসোস আছে কী?
দেখুন, মঞ্চে কিছু অসাধারণ কাজ আমি করেছি। অসাধারণ চরিত্র মঞ্চে পেয়েছি। তার জন্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। টেলিভিশন নাটকেও অনেক ভালো ভালো চরিত্র করার সুযোগ পেয়েছি। এসব চরিত্র আমাকে আনন্দ দিয়েছে। আমাকে শিল্পী হিসেবে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। কিং লিয়ার করতে পারলে ভালো লাগত। পারিনি। আমি মনে করি, এক জীবনে অসাধারণ কিছু চরিত্র করেছি।
শিল্পী কখনো পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারেন না। জীবন নিয়ে আমার আফসোস নেই। কিন্তু শিল্প নিয়ে অতৃপ্তি আছে। কোনো শিল্পী কোনো দিনই পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত হতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে তো কাজ চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো কারণ থাকবে না।
হুমায়ূন আহমেদের অনেক সাড়া জাগানো নাটকে আপনি অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। উনার সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য স্মৃতি আছে?
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলো দর্শকদের মনে দাগ কেটে আছে। তার নাটকগুলো অন্যরকম। বহুব্রীহি, নক্ষত্রের রাত, আজ রবিবার—কত নাটকের নাম বলব। অয়োময় নাটকে কাশেম চরিত্রে অভিনয় করেছি। অয়োময় আমার পছন্দের কাজ। কাশেম চরিত্রটিও অনেক প্রিয়। সবচেয়ে দুঃখ লাগে, অয়োময় নাটক এখন আর দেখতে পাওয়া যায় না। খুব ভালো একটি কাজ ছিল। মানুষ খুব পছন্দ করেছিল এটি।
কনসার্ট বন্ধ, নৌকা বাইচ বন্ধ—এই বিষয়গুলো কীভাবে দেখেন?
এটা হচ্ছে নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারার মতো। কেন এমন ধ্বংস শুরু হয়ে গেছে জানি না। বিটিভির লোগো কেন পরিবর্তন করতে হবে জানি না। বিটিভিতে ভালো ভালো কাজ উপহার দিন। আগের লোগোটার ঐতিহ্য আছে। ৬০ বছরে এসে কেন লোগো চেঞ্জ করতে হবে? কষ্ট লাগে।
নৌকা বাইচ, কনসার্ট—এসব তো দেশীয় সংস্কৃতি। আমরা তো ছোটবেলায় সার্কাস দেখেছি, যাত্রাপালা দেখেছি। তখন চট্টগ্রামে থাকতাম। মাসের পর মাস যাত্রাপালা হয়েছে। কেউ তো লাঠি নিয়ে আসেনি। মারতে আসেনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি তো আপনি সাহিত্যচর্চাও করেন। কীভাবে এই যাত্রা শুরু করেছিলেন?
বুয়েটে পড়ার সময় একটি ম্যাগাজিন দিয়ে লেখালেখি শুরু। একটি নিজের নামে, অপরটি ছদ্মনামে। তারপর বহু পরে বিচিত্রায় লিখেছি। তারকালোক ম্যাগাজিনে লিখেছি। এভাবেই শুরু। প্রথম আলোতে একসময় ‘এসো নীপবনে’ নামে কলাম লিখেছি। এখন আমার বইয়ের সংখ্যা ৪০টি।
আসলে ছোটবেলায় প্রচুর বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি। আব্বা প্রচুর পড়তেন। আব্বা প্রচুর বই কিনতেন। তার কাছ থেকেই বই পড়ার অভ্যাস পেয়েছি। পড়তে পড়তে একসময় লিখতে শুরু করি। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও নাটকও লিখেছি।
জন্মদিন নিয়ে কোনো পরিকল্পনা?
আমার নিজের কোনো পরিকল্পনা নেই। আমার আর নাতনীর জন্মদিন একই দিন। আমার মেয়ে নাতাশার কন্যা। ওর নাম তৃষা। বাসায় হয়তো কোনো সারপ্রাইজ দেবে।
