দুর্দশার সফরে পাকিস্তানের আলোর ঝলকানি রেকর্ডগড়া রাজাউল্লাহ

পুরো সিরিজজুড়ে পাকিস্তান দলের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝড়ের পর ঝড়। দুই টেস্টের চরম ভরাডুবি, দ্বিতীয় টেস্ট শেষ হতেই প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও সহকারী কোচ উমর গুলকে বরখাস্ত করা, একই সঙ্গে একঝাঁক ক্রিকেটারকে দল থেকে ছেঁটে ফেলা—সব মিলিয়ে সফরটা ছিল চরম বিশৃঙ্খলা আর দুর্দশার এক জ্বলন্ত দলিল। কিন্তু এই ঘোর অমানিশার মধ্যেও এজবাস্টনে দেখা মিললো এক টুকরো আলোর। আর সেই আলোর নাম—রাজাউল্লাহ।

টেস্ট অভিষেকের মহোৎসব কাকে বলে, তা নিজের ব্যাট দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন ২১ বছর বয়সী এই তরুণ পেস বোলিং অলরাউন্ডার। পাকিস্তানের সম্ভাব্য হোয়াইটওয়াশের সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করলেন তিনি। ৮১ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংসে নয়-নয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ে বসলেন রাজাউল্লাহ। টেস্ট অভিষেকের কোনো ইনিংসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৯টি ছক্কা মারার নজির এটি। এর আগে ২০০৮ সালে এই কীর্তি গড়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের টিম সাউদি। শুধু তা-ই নয়, ইংল্যান্ডের মাটিতে এক ইনিংসে বেন স্টোকসের সর্বোচ্চ ৯ ছক্কার রেকর্ডটিতেও ভাগ বসিয়েছেন এই তরুণ।

যেখানে ইনিংস পরাজয়ের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল, সেখান থেকে ইংলিশদের হাত থেকে জয়টা অন্তত একদিনের জন্য পিছিয়ে দিলেন তিনি। চতুর্থ ইনিংসে ইংল্যান্ডের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে ১৩০ রানের।

দলের স্কোর যখন ৩১৮ রান, হাতে মাত্র ২ উইকেট এবং পাকিস্তান তখনও ইংলিশদের চেয়ে ২ রানে পিছিয়ে—তখন ক্রিজে আসেন রাজাউল্লাহ। পরাজয় যখন একদম সময়ের ব্যাপার, ঠিক তখনই সতীর্থ পেসার মোহাম্মদ আব্বাসের সঙ্গে গড়ে তোলেন রূপকথার মতো এক জুটি। নবম উইকেটে দুজনে মিলে যোগ করেন ১২১ রান!

ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণকে রীতিমতো পাড়ার বোলিংয়ে রূপ দেন রাজাউল্লাহ। গুস অ্যাটকিনসনকে চার বলের মধ্যে মারেন তিনটি ছক্কা। জোফ্রা আর্চারের ওভারে পরপর দুই বলে ছয় হাঁকিয়ে যখন ৪৩ বলে ফিফটি পূরণ করলেন, তখন আর্চার কেবল মাথায় হাত দিয়ে হাসছিলেন! রাজাউল্লাহর তাণ্ডবে যোগ দিয়ে সতীর্থ পেসার আব্বাসও হাঁকান একটি ছক্কা, করেন ৪২ রান।

নিজের ব্যাটিং তাণ্ডব নিয়ে ম্যাচ শেষে রাজাউল্লাহ স্কাই স্পোর্টসকে হেসে বলেন, ‘আমি তো শুধু ব্যাট হাতে মারছিলাম, আর উপভোগ আপনারা করছেন! ইচ্ছে ছিল ইনিংসটা আরও টেনে নেওয়ার, তবে ৮১ রানও তো মন্দ নয়! ব্যাটে বল ঠিকঠাক লাগছিল, চেষ্টা ছিল অন্য ব্যাটারকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবধানটা যতটা পারা যায় বাড়ানো।’

তাণ্ডবের দিনে ব্যাটিংয়ের একটা মজাদার তথ্যও শেয়ার করেন এই তরুণ, ‘আজ আমার দুই-দুটো ব্যাট ভেঙে গেছে, তিন নম্বর ব্যাটটাও প্রায় শেষ অবস্থা! তবে কোনো সমস্যা নেই, আমি আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে এসেছিলাম, আমার ব্যাগেই মোট ৬টা ব্যাট আছে।’

দিনশেষে সেঞ্চুরির আগেই ড্যান লরেন্সের বলে স্টাম্পড হয়ে যখন ফিরছিলেন, তখন দুই দলের দর্শকরাই দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে বরণ করে নেন এই বিস্ময় বালককে। প্রথম ইনিংসে বল হাতে ৪ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটে এমন রেকর্ডগড়া তাণ্ডব—নিজের অভিষেক টেস্টকে অবিস্মরণীয় এক গল্প বানিয়ে ফেললেন রাজাউল্লাহ।

এর আগে দিনের প্রথম ভাগে শান মাসউদের ৯৫ ও চোট কাটিয়ে ফেরা বাবর আজমের ৭৬ রানের ওপর ভর করে পাকিস্তান ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে। আজান ওওয়াইসও করেন ৫৯ রান। কিন্তু হঠাৎ মিডল অর্ডারের ধসে পাকিস্তান দ্রুত উইকেট হারালে দলের হাল ধরেন সেই রাজাউল্লাহ-আব্বাস জুটি। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৪৯ রান তুলতে সক্ষম হয়।

পুরো সফরে যখন ব্যর্থতার অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই স্পষ্ট নয়, তখন তরুণ রাজাউল্লাহর এই রেকর্ডগড়া লড়াই-ই পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের জন্য একমাত্র ও বড় প্রাপ্তি হয়ে রইলো।

 

Related Articles

Latest Posts