সারাদেশে সারের প্রকৃত চাহিদা মাঠ পর্যায় থেকে সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। ফলে সরকারিভাবে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী দেশের সব জায়গায় সার বরাদ্দ দেওয়া হয় না। এই কারণে অনেক জেলায় সারের সংকট দেখা দেয় বলে সরকারি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলারদের একটি অংশ সিন্ডিকেট করে কৃষি মৌসুমে বাজারে সারের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের তৈরি করা কৃত্রিম সংকটে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে।
নির্ধারিত এলাকার বাইরে সার সরিয়ে নেওয়া, বরাদ্দের অপব্যবহার ও পরিবহনের সময় কারসাজির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২৪ শতাংশ ডিলারের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে গত ৮ সেপ্টেম্বর ১৫টি সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
গত আগস্টের মাঝামাঝি থেকে অনেক জেলার কৃষকেরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না এবং বাধ্য হয়ে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে সার কিনছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কয়েকটি জেলায় ডিলারের কাছে সার না থাকা বা রেশনিং করে সার দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বিক্ষোভও হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে কৃষকেরা সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর কৃষকেরা এক ডিলারের গুদামে ঢুকে সার নিয়ে যান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সারবাহী মাদার ভেসেল গভীর সমুদ্রে নোঙর করার পর লাইটার জাহাজের মাধ্যমে খালাস করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা জাহাজ থেকে সার খালাসে ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি সময় ব্যয় করেন। এতে বাজারে সারের সংকট তৈরি হয় এবং দাম বেড়ে যায়।
এদিকে কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত সারে সরকার ভর্তুকি দিলেও শিল্পপণ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা দেওয়া হয় না। দেশে তামাক শিল্পের বিস্তারের কারণে রংপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় তামাক উৎপাদন বেড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পঞ্চগড়ে চা শিল্পের বিস্তারের কারণে কৃষি খাতে বরাদ্দ সারের একটি অংশ চা ও তামাকের মতো শিল্প ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের যোগসাজশে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ কৃষক পর্যায়ে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে সরকারি গুদাম ও ডিলার পর্যায়ে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া, সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি, নির্দিষ্ট ক্রেতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং দাম বাড়াতে অবৈধভাবে সার মজুত করার অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছর ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমের দাম বাড়ায় কৃষিকাজ এমনিতেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে ফসল কাটার পর এসব খরচ উঠবে কি না, তা নিয়ে কৃষকেরা এখন উদ্বিগ্ন। প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ ৭৯ হাজার টন সার মজুত রয়েছে।
পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলারদের যোগসাজশে নির্ধারিত গন্তব্যে সার পৌঁছাতে বাধা দেওয়া অথবা কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য সার মজুত করার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন কয়েকটি নির্দিষ্ট লাইসেন্সধারী কোম্পানির মাধ্যমে সার পরিবহন করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিলার ও পরিবহন কোম্পানিগুলো পরস্পরের যোগসাজশে সময়মতো সার খালাস ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায়।
সরকার ভর্তুকি দেওয়ায় বাংলাদেশে সারের দাম ভারতের তুলনায় কম। এই সুযোগ নিয়ে ডিলার ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে পাচার হচ্ছে সার। প্রতিবেদন অনুসারে, রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্ত।
এছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, কর্ণফুলী নদীর মোহনা এবং বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা দিয়ে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে ইউরিয়া সার।
বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, আইস ও অন্যান্য ভয়ংকর মাদকের চালান বাংলাদেশে ঢুকছে। এ ঘটনায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ থানায় মামলা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবমুক্ত স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যোগ্যতার ভিত্তিতে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচন, ডিলারদের সার সংগ্রহ ও বিতরণ অনলাইনে নজরদারি এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে ডিলারশিপ বাতিলসহ দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে পুলিশের বিশেষ শাখা।
ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের সার সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিক্রি ডিজিটালভাবে নজরদারি করা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং মজুতদারি বা সিন্ডিকেটের প্রমাণ পাওয়া গেলে ডিলারশিপ বাতিলসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
সার কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, গ্যাসের চাপ ও সরবরাহের জন্য আলাদা সংরক্ষিত কোটা ও অর্থ বরাদ্দ এবং সংকটকালে নিরাপদ মজুত বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ইউরিয়া আগেই আমদানি করার সুপারিশ রয়েছে।
একই পরিবারের একাধিক সদস্য, একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে বাজারে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সীমিত করা এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সার পরিবহন ও বিক্রিতে বিশেষ নজরদারির সুপারিশ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সার সংকটের প্রকৃত কারণ কী, এই প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় তথ্য পর্যালোচনা ও যাচাই করে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইন উস সালাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সরকারের কৃষি পরিকল্পনায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, সংকট দেখা দেওয়ার পর পদক্ষেপ নেওয়া দুর্বল পরিকল্পনা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার প্রমাণ।
আগেই ঝুঁকি শনাক্ত, নজরদারি জোরদার ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, একই ধরনের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে জন্য কৃষি নীতিতে সুস্পষ্ট আপৎকালীন পরিকল্পনা, সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও সময়মতো সংশোধনমূলক পদক্ষেপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
