ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র এতদিন পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি, পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের দপ্তরের নতুন এক প্রতিবেদনে তার একটি বিস্তৃত হিসাব উঠে এসেছে।
এতে দেখা গেছে, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন সামরিক উড়োজাহাজ ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আল জাজিরা, সিএনএন ও সিএনবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসের তথ্য নিয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনটি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ক্ষয়ক্ষতির প্রথম আনুষ্ঠানিক হিসাব। প্রতিবেদনে পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের দপ্তরের পাশাপাশি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও ইউএসএআইডির মহাপরিদর্শকের দপ্তরের কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে ব্যবহৃত গোলাবারুদের পেছনে। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণে মার্কিন কৌশলগত মজুতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং নতুন করে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্পভিত্তিক ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ‘বটলনেক’ বা সংকটও সামনে এসেছে।
এই তথ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুতকে প্রায় ‘সীমাহীন’ বলে দাবি করেছিলেন। প্রতিবেদনের প্রকাশের দিনও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদনকে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে দাবি করেন।
কয়েক ডজন উড়োজাহাজ ও ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সামরিক উড়োজাহাজ ও ড্রোন হারানো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত চারটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ১ মার্চ কুয়েতের আকাশে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারে’ ভূপাতিত হয়। আরেকটি এপ্রিল মাসে ইরানের ওপর যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়। এসব ঘটনায় বিমানের সব ক্রুকে উদ্ধার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি এফ-৩৫এ-ও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে এটিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ যুদ্ধের সময় শত্রুর হামলায় এই ধরনের যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
একটি এ-১০ স্থল আক্রমণকারী বিমানও ইরানের হামলায় ধ্বংস হয়েছে।
আকাশে যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত কেসি-১৩৫ ট্যাংকারের অন্তত সাতটি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে একটি ১২ মার্চ ইরাকে জ্বালানি সরবরাহের মিশনের সময় বিধ্বস্ত হয় এবং এতে ছয়জন ক্রু নিহত হন। সৌদি আরবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মাটিতে থাকা আরও কয়েকটি কেসি-১৩৫ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে থাকা একটি ই-৩ সেন্ট্রি বিমানও ইরানের পরবর্তী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া, একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোনের অন্তত একটি এপ্রিলে বিধ্বস্ত হয়। এ ধরনের একটি ড্রোনের মূল্য প্রায় ২৪০ মিলিয়ন ডলার।
ইরানে একটি যুদ্ধ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সময় উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে চারটি এএইচ-৬ হেলিকপ্টার মার্কিন বাহিনী নিজেই ধ্বংস করে। ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছে একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টারও ভূপাতিত হয়।
১ জুলাই আরব সাগরে একটি এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। চার সদস্যের ক্রুর মধ্যে তিনজন আহত অবস্থায় উদ্ধার হন এবং একজন নিখোঁজ ছিলেন।
তবে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনে। যুদ্ধের সময় ৩০টির মতো দীর্ঘসময় উড্ডয়নে সক্ষম সশস্ত্র এই ড্রোন ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ভুল হামলায় এসব ড্রোন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান অবশ্য আরও কয়েকটি মার্কিন নজরদারি ও হামলাকারী ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। তেহরান চলতি মাসের শুরুতে একটি মার্কিন ‘ডাইভ-এলডি’ সাবমার্সিবল আটক করেছে বলেও দাবি করেছে।
সামরিক ঘাঁটির শত শত স্থাপনার ক্ষতি
ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির অবকাঠামোতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
তবে সামরিক স্থাপনাগুলোর ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।
হামলার কারণে মার্কিন বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কার্যক্রমের ধরনও বদলাতে হয়েছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম হামলার মুখে বিভিন্ন জায়গা থেকে জনবল, সামরিক সরঞ্জাম ও মজুত সরিয়ে নেয়।
ইরাক ও কুয়েত থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীর চিকিৎসা-উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে অধিকাংশ চিকিৎসা-উদ্ধার কার্যক্রম আকাশপথের পরিবর্তে স্থলপথে স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিচালনা করতে হয়েছে।
বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে উপযুক্ত নৌঘাঁটি ও সরবরাহকেন্দ্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।
এর ফলে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপকে সমুদ্রপথে সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু সেখান থেকে সরবরাহ পাঠাতে দীর্ঘ সময় লাগছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহের একটি চক্রে ১৪ থেকে ১৮ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরবরাহের মাঝেমধ্যে ঘাটতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ডাকব্যবস্থায় বিঘ্ন। পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী মার্কিন সেনা ও নৌসদস্যদের জন্য এতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক স্থাপনাতেও বড় ক্ষতি
ইরানের হামলা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও রেহাই পায়নি। ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১৮৪ মিলিয়ন ডলার।
ইরাকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। জুনের শেষ নাগাদ সেখানে মার্কিন স্থাপনার ওপর ৬০০টির বেশি হামলা হয়েছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে। এসব হামলায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫৭ মিলিয়ন ডলার।
এরবিলে মার্কিন কনস্যুলেটের নতুন কমপ্লেক্সের একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেখানে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি হয়েছে। বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত বাগদাদ ডিপ্লোম্যাটিক সাপোর্ট সেন্টার অবশ্য ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
কুয়েত সিটিতে মার্কিন দূতাবাস ৫ মার্চ কার্যক্রম স্থগিত করে। আঞ্চলিক উত্তেজনা, হামলা এবং দূতাবাসের ক্ষয়ক্ষতির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে প্রায় ১৪ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
৩ মার্চ সৌদি আরবের রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে দুটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে প্রায় ১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। দূতাবাসের কমপ্লেক্সে থাকা সিআইএ স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটের একটি ইউটিলিটি ভবনও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখানে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার।
সাড়ে তিন হাজার কূটনৈতিক কর্মীকে সরানো হয়
যুদ্ধের প্রভাব শুধু স্থাপনার ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিপুলসংখ্যক মার্কিন কূটনৈতিক কর্মীকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কূটনৈতিক কর্মী অঞ্চলটির বাইরে ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক কর্মী ও পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বেশিরভাগ মার্কিন কূটনৈতিক মিশন এখনো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরেনি। কিছু কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অবশ্য ধীরে ধীরে অঞ্চলে ফিরতে শুরু করেছেন।
প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা
যুদ্ধে মার্কিন সামরিক সদস্যদেরও প্রাণহানি হয়েছে। পেন্টাগনের হিসাবে, অন্তত ১১ জন মার্কিন সামরিক সদস্য যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। আরও সাতজন ‘অ-শত্রুতামূলক ঘটনায়’ মারা গেছেন।
ইরানের হামলায় ৩০ জুন পর্যন্ত অন্তত ৪১৭ জন মার্কিন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব প্রাণহানি ও কয়েকটি উড়োজাহাজ হারানোর ঘটনা এর আগেই প্রকাশ্যে এসেছিল। তবে নতুন মূল্যায়ন প্রথমবারের মতো সামরিক সরঞ্জাম, স্থাপনা, গোলাবারুদের মজুত ও কূটনৈতিক ক্ষতির চিত্রকে একসঙ্গে সামনে এনেছে।
যুদ্ধের প্রভাব কি দীর্ঘস্থায়ী হবে?
ইরানের হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার কিছু অংশ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও স্থায়ী হতে পারে বলে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
বাহরাইনের নৌঘাঁটির ক্ষতি, দিয়েগো গার্সিয়ার ওপর বাড়তি নির্ভরতা, চিকিৎসা-উদ্ধার ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং সরবরাহচক্র দীর্ঘ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো দেখাচ্ছে, ইরানের হামলার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্র ও বিমানের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনের প্রশ্ন। যুদ্ধের কয়েক মাসেই বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং নতুন করে সেই মজুত পূরণ করতে গিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে।
এদিকে এই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশের সময়ই ইরান কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ১৬ সেপ্টেম্বর চীন সফরে যাচ্ছেন। বেইজিং ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকায় যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও জোরালোভাবে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
