এনসিপির পুনর্গঠন, শীর্ষ নেতৃত্বে আসছে বড় রদবদল

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠিত হচ্ছে। শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সামান্তা শারমিন ও নাহিদা সারওয়ার নিভাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।

তবে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব হিসেবে নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেন বহাল থাকতে পারেন। মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের পদ বিলুপ্ত করা হবে।

পুনর্গঠিত কমিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সারজিস আলমকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

নতুন কাঠামোতে অন্তত ১০ জন সদস্য যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। দলীয় নীতি নির্ধারণী দায়িত্বের পাশাপাশি বিশেষায়িত উপকমিটি ও সেলগুলোর তত্ত্বাবধান করবেন তারা। এগুলো সংগঠন, অর্থায়ন, গণমাধ্যম এবং জননীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করবে।

এই প্রস্তাবিত পুনর্গঠনের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে দলের প্রভাব ও পরিধি বিস্তৃত করা। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে জাতিসত্তাবিষয়ক সেল ও জাতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান জোট গঠন এবং ‘জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক শক্তি’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী ও সমাজসেবামূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। প্ল্যাটফর্মটি ফেব্রুয়ারির জাতীয় কাউন্সিল ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রমে সহায়তা করবে।

দলীয় সূত্র জানায়, গত দুই সপ্তাহে রাজনৈতিক পর্ষদ দুই দফা বৈঠক করে পুনর্গঠনের মূল কাঠামো নিয়ে একমত হয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের দায়িত্ব থাকছে নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের হাতে। 

পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি ও রাজনৈতিক পর্ষদের তালিকা প্রাথমিকভাবে মঙ্গলবার ঘোষণার কথা ছিল। তবে সূত্র জানিয়েছে, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর সফর শেষে নাহিদ ইসলাম ফিরলে বুধ বা বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির দুজন জ্যেষ্ঠ নেতা দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, দলের প্রস্তাবিত নতুন নেতৃত্ব কাঠামোতে বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারওয়ার নিভাকে রাখা হয়নি। তবে দুজনই দল ও উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন।

ওই নেতাদের ভাষ্য, জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে এনসিপির অংশগ্রহণের প্রতিবাদে দলের কাউন্সিল থেকে সামান্তা ও নিভার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

এরপর থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের সক্রিয়তা কম ছিল। তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে কয়েকটি সাধারণ সভায় সামান্তাকে দেখা গিয়েছিল।

তারা আরও জানান, নতুন নেতৃত্ব কাঠামোয় ১৬ জন সদস্য রয়েছেন। এই রদবদলে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ আরও দায়িত্বশীল পদে আসবেন। দুজনই দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হতে পারেন।

বিপরীতে, নতুন কাঠামোয় দলের বর্তমান মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাংগঠনিক ক্ষমতা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। আসিফ ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব করা হতে পারে।

নতুন কাঠামোয় রাজনৈতিক পর্ষদ গঠিত হবে ১৬ জন সদস্য নিয়ে। এর মধ্যে ১০ সদস্য যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তারা হলেন— আবদুল্লাহ আল আমিন, আরিফুল ইসলাম আদীব, আতিকুর রহমান মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ, আলী আহসান জুনায়েদ, সারোয়ার তুষার, আকরাম হুসাইন, সালেহউদ্দিন সিফাত, মাহমুদা আলম মিতু ও নুসরাত তাবাসসুম৷

সূত্র জানায়, ভবিষ্যতে মেধা ও অভ্যন্তরীণ আলোচনার ভিত্তিতে আরও একজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করে পর্ষদ সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিবেচনা করছে দলটি।

রাজনৈতিক পর্ষদের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, প্রধান দপ্তরগুলোর পুনর্বণ্টনও নীতিগতভাবে চূড়ান্ত হয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ, সাংগঠনিক কার্যক্রম, অর্থ, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য দায়িত্ব পরিষদ সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে।

জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী রাজনৈতিক সংযোগ উপকমিটির প্রধান হবেন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের বিষয়টি তদারকি করবেন। তিনি এনসিপির অধিভুক্ত সংগঠন ‘জাতীয় যুব শক্তি’রও তত্ত্বাবধান করবেন।

সারোয়ার তুষার গণমাধ্যম, জনসংযোগ, ব্র্যান্ডিং ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করবেন। আবদুল্লাহ আল আমিন অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক নীতি নির্ধারণী এবং সংশ্লিষ্ট উপকমিটিগুলোর প্রধান হবেন।

দলটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অফিস প্রশাসন, অর্থ, মানবাধিকার এবং আইনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায় ৩০টি বিশেষায়িত সম্পাদকীয় বা সেল পোর্টফোলিও বিতরণের পরিকল্পনাও করেছে। সংশ্লিষ্ট সেলগুলোতে সম্পাদক এবং সহযোগী সম্পাদক থাকবেন।

রাজনৈতিক পর্ষদের বাইরে কেন্দ্রীয় কমিটিকে আরও বিস্তৃত করতে এনসিপি আরও ১০ থেকে ১১ জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাত থেকে আটজনকে যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।

তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয় জোরদার করতে সারজিস আলমের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি সাংগঠনিক উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আরিফুল ইসলাম আদীব এবং আলী আহসান জুনায়েদ।

এই কাঠামোর আওতায় দেশের বিভাগ ও জেলাপর্যায়ে দলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০ জন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১০ জন সহযোগী সাংগঠনিক সম্পাদক দায়িত্ব পালন করবেন।

পুনর্গঠন পরিকল্পনায় জাতিসত্তাবিষয়ক একটি সেল এবং প্রস্তাবিত জাতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান জোট গঠনের বিষয়ও রয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য।

জাতিসত্তাবিষয়ক সেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং অবাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীকে শুধু ভোটার হিসেবে নয়, সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকারের পক্ষে কাজ করাই হবে এ সেলের উদ্দেশ্য।

জাতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান জোট গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জোরদার এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর লক্ষ্যে। সূত্র জানায়, এটি এনসিপির সরাসরি কোনো শাখা হিসেবে নয়, বরং স্বতন্ত্র সহযোগী সংগঠন হিসেবে কাজ করবে। নিজস্ব নীতি ও সাংগঠনিক বিষয়ে সংগঠনটির স্বায়ত্তশাসন থাকবে।

এ ছাড়া দলের সামাজিক সেবা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক প্ল্যাটফর্ম ‘জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক শক্তি’ গঠনের প্রস্তুতিও চলছে।

এনসিপির অন্যতম প্রধান সহযোগী নারী সংগঠন জাতীয় নারীশক্তির শীর্ষ নেতৃত্বেও পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

সংগঠনটির শীর্ষ তিন পদ আহ্বায়ক, সদস্যসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নতুন মুখের কথা বিবেচনা করছে এনসিপি।

এ জন্য পাঁচ নারী নেত্রীর নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন—মাহমুদা আলম মিতু, মনিরা শারমিন, নুসরাত তাবাসসুম, হুমায়রা নূর ও মঞ্জিলা ঝুমা। তাদের মধ্য থেকে তিনজনকে শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, মঞ্জিলা ঝুমা ও হুমায়রা নূরকে কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। বিষয়টি এখনো চলমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনাধীন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারওয়ার তুষার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং আগামী বছর দলের প্রথম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা সামনে রেখে নেতৃত্ব পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি জানান, নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ও রাজনৈতিক পর্ষদের তালিকা ঘোষণার পর জ্যেষ্ঠ নেতারা বিভাগ ও জেলাপর্যায়ে সফর শুরু করবেন। এর মাধ্যমে দলের তৃণমূল সংগঠন পুনর্গঠন এবং নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।

সারোয়ার তুষার আরও বলেন, ‘আমরা দলকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, আধুনিক ও সুসংগঠিত করতে কাজ করছি। চূড়ান্ত তালিকা খুব শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।’

Related Articles

Latest Posts