নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট: লৌহ মুষ্টির এপিঠ-ওপিঠ

ইসরায়েলের নির্বাচনে এগিয়ে থাকা দুই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও গাদি আইজেনকোটের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল অনেক বেশি। তবে ফিলিস্তিন নিয়ে ভাবনায় দুজনের খুব একটা তফাত নেই।

একদিকে আছেন নেতানিয়াহু। জেরুজালেমের সচ্ছল পরিবারে বেড়ে উঠলেও নিজেকে সাধারণ মানুষের একজন হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন তিনি। সাবলীল ইংরেজি, মার্কিন বাচনভঙ্গি ও বক্তৃতার দক্ষতা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি সমর্থকদের আকৃষ্ট করেছেন।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর সরকারের সময় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান ছিলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকোট। লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে অবসরে যাওয়ার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

আইজেনকোট বেড়ে উঠেছেন খেটে খাওয়া মানুষের শহর এইলাতে। সাধারণ ও সীমিত আয়ের পরিবারের মানুষ এই শহরের বাসিন্দাদের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পান। ইসরায়েলের পদাতিক বাহিনীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গোলানি ব্রিগেডে যোগ দিয়ে সামরিক জীবন শুরু করেন তিনি। ধাপে ধাপে পৌঁছান বাহিনীর শীর্ষ পদে।

আইজেনকোট বক্তা হিসেবে খুব পরিশীলিত কিংবা অসাধারণ নন। তবে খেটে খাওয়া মানুষ তাকে নিজেদের কাছের লোক বলে মনে করেন।

নেতানিয়াহু আশকেনাজি ইহুদি, তার পূর্বপুরুষরা ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত। অন্যদিকে, আইজেনকোট মিজরাহি। মধ্যপ্রাচ্য বা প্রাচ্যের ইহুদিদের এ নামে ডাকা হয়। তার বাবা-মা মরক্কো বংশোদ্ভূত। ইসরায়েলে এখন পর্যন্ত কোনো মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী হননি।

ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যা কিংবা ‘যুদ্ধ’কে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বলে মনে করেন ইসরায়েলিরা। এই যুদ্ধে নেতানিয়াহুর ছেলেদের ভূমিকা খুবই সামান্য হলেও আইজেনকোটের এক ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর আইজেনকোট নিজে গাড়ি চালিয়ে ছেলেকে অ্যাসেম্বলি পয়েন্টে পৌঁছে দিয়েছিলেন, যাতে সে যুদ্ধে যেতে পারে। ওই বছরের ডিসেম্বরে সেনাবাহিনীতে চিকিৎসাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আইইডি বিস্ফোরণে তার ছেলে নিহত হন।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর ছোট ছেলে গত তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মিয়ামিতে সময় কাটাচ্ছেন।

এই নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট দুজনই একে অপরকে ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে অতিরিক্ত ‘নরম’ অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে সমালোচনা করেছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৭৪ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের বিষয়ে ‘নরম’ বলে মন্তব্য করেন আইজেনকোট।

এদিকে আইজেনকোট নিজেই ‘দাহিয়া ডকট্রিনের’ প্রবক্তা। অসামঞ্জস্যপূর্ণ মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করাকে বলা হয় দাহিয়া ডকট্রিন। লেবাননের ঘনবসতিপূর্ণ দাহিয়া উপশহরের নাম থেকে এ মতবাদের নাম এসেছে। এলাকাটি হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি ছিল। ২০০৬ সালে আইজেনকোটের নির্দেশে সেখানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়।

যুদ্ধের শুরুতে ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পরপরই আইজেনকোট বলেছিলেন, আগে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা দরকার। তবে নেতানিয়াহু জিম্মিদের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। নিজের উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক জোট টিকিয়ে রাখতে গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার জন্যও নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন আইজেনকোট।

তবে এবারের নির্বাচনেও বিভাজন তীব্র। অনেকেই একে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন বলে অভিহিত করেছেন।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার অতি ডানপন্থী এবং কট্টর ধর্মীয় মিত্ররা ৫১ থেকে ৫২টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিবিসি।

অন্যদিকে, আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ও তার ‘চেঞ্জ ব্লক’-এর তিনটি ইহুদি দল মিলিয়ে প্রায় ৫১টি আসন পেতে পারে।

বুধবার ভোরে ইসরায়েলের সম্প্রচারমাধ্যম কান ও চ্যানেল ১৩-এর হালনাগাদ বুথফেরত জরিপে দুই জোটের ৫১টি করে আসন পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তবে চ্যানেল ১২-এর হিসাবে নেতানিয়াহুর জোট ৫২টি এবং আইজেনকোটের জোট ৪৯টি আসন পেতে পারে।

ফলে সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বুথফেরত জরিপে আরব দলগুলোর জন্য ১৮ থেকে ১৯টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা তাদের জন্য রেকর্ড হতে পারে। ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী জোটকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছে আরব দলগুলো।

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাই ভোটার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। এবার ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। মঙ্গলবার রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সময় দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।

হারেৎজ জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক আরব ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ায় নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, আরবরা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন ‘চুরি’ করার চেষ্টা করছে।

নেসেটে কোনো দলের প্রবেশের জন্য মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। এই সীমা অতিক্রম করতে পারলে একটি দল চারটি আসন পায়।

ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে ৭০ লাখের কিছু বেশি ইহুদি ইসরায়েলি এবং গ্রিন লাইনের, অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের আগের ইসরায়েলের সীমান্তের ভেতরে বসবাসকারী ১৭ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকের ভোটাধিকার রয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাসকারী পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরও ভোটাধিকার রয়েছে। কিন্তু সেখানে বসবাসকারী ৩১ লাখ ফিলিস্তিনির ভোটাধিকার নেই। একইভাবে, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি ইসরায়েলির ভোটাধিকার থাকলেও সেখানে বসবাসকারী প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি ভোট দিতে পারেন না।

বিবিসি জানিয়েছে, বুধবার রাত থেকে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ শুরু হওয়ার কথা। তবে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ভোটসহ প্রায় ছয় লাখ অনুপস্থিত ভোট গণনা বৃহস্পতিবারের আগে শেষ হওয়ার কথা নয়। এসব ভোট মোট ভোটের প্রায় ১০ শতাংশ।

চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি এমন দলীয় নেতাকে দায়িত্ব নেওয়ার আমন্ত্রণ জানাবেন। এ প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত নতুন নির্বাচন হতে পারে।

তাই নির্বাচনে কে এগিয়ে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—কে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে পারবেন। আরব দলগুলোর অবস্থানই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Related Articles

Latest Posts