ঢাকাই সিনেমার বক্স অফিস হবে কী?

‘বক্স অফিস হিট সিনেমা’—এমন কথা অনেকেই আমরা শুনেছি। কিন্তু বক্স অফিস কী? আমাদের ঢাকাই সিনেমার বক্স অফিস আছে কিনা, এই বিষয়ে অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে।

সিনেমার টিকেট বিক্রির সব হিসাব যেখানে রাখা হয়, সেটাই বক্স অফিস। কতগুলো টিকেট বিক্রি হলো, কতো টাকার টিকেট বিক্রি হয়েছে, সব হিসাবই সেখানে থাকে। এর মাধ্যমে টিকেট বিক্রি থেকে সিনেমার আয়ের হিসাবটা পাওয়া যায়।

কিন্তু বাংলাদেশের সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হলের কোনো বক্স অফিস নেই। কিছু প্রেক্ষাগৃহে ই-টিকেটিং শুরু করলেও সবগুলোতে নেই। বক্স অফিস না থাকায় দেশব্যাপী মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলোর সঠিক আয় জানা সম্ভব হয় না।

এই ডিজিটাল যুগে এসেও বাংলাদেশে কেন বক্স অফিস করা সম্ভব হয়নি? জানার চেষ্টার দ্য ডেইলি স্টার কথা বলেছে সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হলের কর্ণধার, মাল্টিপ্লেক্সের প্রতিনিধি, সিনেমার পরিচালক, প্রযোজক ও প্রদর্শক সমিতির প্রতিনিধির সঙ্গে।

স্টার সিনেপ্লেক্সের মিডিয়া প্রধান মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘স্টার সিনেপ্লেক্স শুরু থেকেই শতভাগ স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করে। আমরা সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনলাইন ও কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি করি। যার ফলে আমাদের প্রতিটি হলের রিপোর্ট ও ডেটা একদম নিখুঁত ও স্বচ্ছ।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই স্বচ্ছ পদ্ধতি যদি পুরো দেশের সব সিনেমা হলে চালু করা যায়, তবেই একটি আদর্শ ও কেন্দ্রীয় বক্স অফিস গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য সরকারি উদ্যোগ, মাল্টিপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিন হলগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং একটি সেন্ট্রাল সার্ভার বা সফটওয়্যার নেটওয়ার্কের প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে যদি একটি কেন্দ্রীয় বক্স অফিস বা ডেটা ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু হয়, তাহলে কোন সিনেমা কেমন ব্যবসা করছে তা সবাই নির্ভুলভাবে জানতে পারবে। এটি প্রযোজকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে, নতুন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করবে এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

পরিচালক রায়হান রাফী বলেন, ‘বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমার জন্য বক্স অফিস অবশ্যই লাগবে। এটা বাংলা সিনেমার জন্য বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এটা এখন জরুরির চেয়ে বেশি সময়ের দাবি। কারণ, বক্স অফিস ছাড়া সিনেমায় আয়ের আসল হিসাব কোনোদিন পাওয়া যাবে না। এখন এটা একদম হল মালিকদের ইচ্ছামতো হয়। শুধুমাত্র কয়েকটা প্রেক্ষাগৃহের ই-টিকেটিং হিসাব পাওয়া যায়। বাকিরা সেই আগের মতোই চলছে।’

তিনি বলেন, ‘এই ডিজিটাল যুগে মানুষ গিয়ে গুনবে কতোজন সিনেমা দেখছে? এটা আসলে হয় না। প্রযোজক সিনেমা বানাবে, তারপর হলে হলে লোক পাঠাবে। বিভিন্ন হলের জন্য আলাদা আলাদা মানুষ যাবে, তাদের টাকাও প্রযোজক দিবে। এটা আসলে এই ডিজিটাল যুগে দুনিয়ার কোথাও হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আস্তে আস্তে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি বড় হচ্ছে। এখন আমাদের বক্স অফিস হওয়া খুব প্রয়োজন। তাহলে আসল হিসাবটা পাবো। তা না হলে আমাদের অপেক্ষা করে থাকতে হয়, প্রযোজক যে যে অংক বলে সেটা ধরে নিতে হয়। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও এমন হয় না।’

চলচ্চিত্র পরিচালক হিমেল আশরাফ বলেন, ‘একটা সিনেমা কত টাকা ব্যবসা করল এটা সবাই জানতে পারলে ভালো। প্রযোজক তার টাকার হিসাব জানবেন। নতুন কেউ যদি বিনিয়োগ করতে চান তারা একটা ধারণা পাবেন যে ঠিক কত টাকা কোন সিনেমায় লগ্নি করা উচিত। আবার সরকারও রাজস্বর ব্যাপারে একটা ধারণা পাবে।’

তিনি বলেন, ‘তবে সেক্ষেত্রে তথ্যটা হতে হবে সঠিক। আর সঠিক তথ্যের জন্য সব হলে ই-টিকেটিং জরুরি। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ঠিক কোথায় দাড়িয়ে আছে সেটা বোঝার জন্যও বক্স অফিসের বিকল্প নেই।’

চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক অনন্য মামুন বলেন, ‘আমাদের দেশে বক্স অফিস না থাকার মূল কারণ হলো, সিঙ্গেল স্ক্রিন হল মালিকদের উদাসীনতা। যখন প্রেক্ষাগৃহে বক্স অফিস থাকবে, তখন হিসাব করে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হবে। সেটা তারা দিতে চান না, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।’

তিনি বলেন, ‘সারা বছর চালানোর মতো আমাদের কনটেন্ট নেই। যদি সারা বছরে চালানোর মতো বড় বড় কনটেন্ট থাকতো তাহলে আমরা প্রযোজকরা চাপ প্রয়োগ করে বক্স অফিস করতে বাধ্য করতে পারতাম। আমাদের সিনেমার বাজার এখন হয়ে গেছে দুই ঈদকেন্দ্রিক। কাজেই আমরা দুইপক্ষই দোষী আর অসহায়।’

মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, ‘সিনেমা হলে একটা সিনেমা কতো টাকার ব্যবসা করলো সেটার জন্য বক্স অফিস থাকা জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে এটা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয়নি। এটা হলে সবকিছুর হিসাব পাওয়া যাবে।’

তিনি বলেন, ‘আমার সিনেমা হলে কোন শোতে কতো টিকেট বিক্রি হলো সেটা বলি। এখানে লুকোচুরি নেই। কিন্তু, বক্স অফিস হলে ভালো হয়। তবে তার আগে প্রতি মাসে ভালো বাংলা সিনেমার ব্যবস্থা করতে হবে।’

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব কোনো সার্ভার নেই। বিভিন্নজনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে সিনেমা প্রদর্শন করি। সেই কারণে সিনেমা হলগুলোতে বক্স অফিস নেই। এগুলো যদি বিএফডিসির মাধ্যমে ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে সবকিছুর সমাধান হবে বলে আমার বিশ্বাস।’

তিনি বলেন, ‘সারাদেশে সিঙ্গেল স্ক্রিন হলের সংখ্যা এখন খুব বেশি নয়। অনেক অত্যাধুনিক প্রেক্ষাগৃহ হচ্ছে। এসব হলে অবশ্যই বক্স অফিস থাকবে। তাহলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম ঠিক হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। আধুনিক সময়ে বক্স খুব জরুরি।’

Related Articles

Latest Posts