এবার ব্যয়বহুল ও জটিল রোগের ওষুধ উৎপাদনে নজর

দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের পর এবার আরও জটিল ও উচ্চমূল্যের ওষুধ উৎপাদনে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প। বায়োলজিক, ইমিউনোথেরাপি ও বিরল রোগের ওষুধ উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে যেমন রপ্তানি বাড়াতে চায় কোম্পানিগুলো, অন্যদিকে রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা আরও সাশ্রয়ী করতে চায় তারা। 

২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হেপাটাইটিস সি-এর যুগান্তকারী ওষুধ সোফোসবুভির বাজারে আসে। প্রতি ট্যাবলেটের দাম ছিল প্রায় এক হাজার ডলার। ফলে অনেক রোগীর নাগালের বাইরে চলে যায় চিকিৎসা। 

তবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার (ট্রিপস) ছাড়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো এই ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ উৎপাদন করে। এতে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য হয়। 

এক দশকের বেশি সময় পর দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো একই মডেল অনুসরণ করে আরও উচ্চমূল্যের নতুন প্রজন্মের ওষুধ উৎপাদনে মনোযোগ দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বায়োলজিক, ইমিউনোথেরাপি এবং বিরল রোগের চিকিৎসার ওষুধ। 

এর একটি উদাহরণ সিস্টিক ফাইব্রোসিসের চিকিৎসার ওষুধ। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ভেরটেক্স ফার্মাসিউটিক্যালসের ট্রিকাফটা ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ তৈরি করে বাংলাদেশে ট্রিকো নামে বাজারে এনেছে। 

কোম্পানিটির দাবি, এই ওষুধের দাম মূল ব্র্যান্ডের তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ কম। ফলে রোগীদের চিকিৎসা অনেক বেশি সাশ্রয়ী হয়েছে। 

বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে। পাশাপাশি প্রায় ১৬৬টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে বছরে ২০ কোটির বেশি মার্কিন ডলার আয় করছে। 

দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্প জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের জন্য পরিচিত ছিল। এখন কোম্পানিগুলো বায়োলজিক, ইমিউনোথেরাপি ও কাঁচামাল (এপিআই) উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নত গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জটিল ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলছে। 

তাদের মতে, এতে উন্নত চিকিৎসা আরও সহজলভ্য হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা বাড়বে। 

জটিল ওষুধ উৎপাদনে অগ্রগতি

এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান, যার ইনজেকশন উৎপাদন কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (ইউএস এফডিএ) অনুমোদন পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রথম বাংলাদেশি কোম্পানি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে জটিল ইনজেকশনজাত ওষুধও রপ্তানি করেছে। 

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান বলেন, এটি শুধু এসকেএফ নয়, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্যও বড় অর্জন। 

করোনা মহামারির সময় এসকেএফ রেমডেসিভির, মলনুপিরাভির ও নির্মাত্রেলভির-রিটোনাভিরের জেনেরিক সংস্করণ উৎপাদন করে বাংলাদেশসহ ৪৯টি দেশে সরবরাহ করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ক্যানসারের ওষুধ, ইমিউনোথেরাপি, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি এবং বায়োলজিক ওষুধও উৎপাদন করছে। 

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রাব্বুর রেজা বলেন, সিস্টিক ফাইব্রোসিসের জেনেরিক ওষুধ তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল রোগীদের চিকিৎসা সহজলভ্য করা, মুনাফা নয়। 

২০২২ সালে বিভিন্ন দেশের রোগী সংগঠনের অনুরোধে প্রতিষ্ঠানটি এই প্রকল্প শুরু করে। প্রায় তিন বছরের গবেষণার পর তারা ওষুধটি তৈরি করে।

তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে একজন রোগীর বছরে চিকিৎসা ব্যয় প্রায় তিন লাখ ৭০ হাজার ডলার, সেখানে তাদের তৈরি ওষুধে খরচ প্রায় ১২ হাজার ৭৫০ ডলারে নেমে এসেছে। 

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর ট্রিপস সুবিধা সীমিত হয়ে গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পেটেন্ট ওষুধ উৎপাদন আরও কঠিন হতে পারে। 

ক্যানসারের ওষুধের দাম কমেছে

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের কর্মকর্তাদের মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ফলে ক্যানসারের অনেক ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। 

প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের পরিচালক মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, ২০০৬ সালে বিকন ক্যানসারের ওষুধের বাজারে প্রবেশ করে। সে সময় বাজারে মূলত আমদানি করা ওষুধই ছিল, যার দাম অনেক রোগীর নাগালের বাইরে ছিল।

তিনি বলেন, বিকনের প্রথম দিকের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত একটি কেমোথেরাপির ওষুধের প্রতি ডোজের দাম প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমে ৭০০ টাকায় নেমে আসে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির ওষুধ উৎপাদনেও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে নির্দিষ্ট ধরনের ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওসিমার্টিনিবও রয়েছে।

পল্লব বলেন, ২০২৩-২৪ সালে নিউজিল্যান্ড তাদের নীতিমালায় পরিবর্তন এনে বিকনের তৈরি জেনেরিক ওসিমেরটিনিব আমদানির অনুমতি দেয়। তার মতে, এটি বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তার ভাষ্য, বিদেশে যে ইমিউনোথেরাপির একেকটি চিকিৎসা চক্রের খরচ কয়েক মিলিয়ন টাকা, সেই একই ধরনের চিকিৎসা এখন দেশে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশে ক্যানসারের চিকিৎসার বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ওষুধের বাজার প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। স্থানীয়ভাবে ওষুধ উৎপাদনের ফলে চিকিৎসার ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে।

গবেষণাই পরবর্তী প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি 

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান আবদুল মুক্তাদির বলেন, ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) ধারাবাহিক বিনিয়োগের ওপর। বায়োলজিক, টিকা ও কাঁচামাল উৎপাদনে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। 

তিনি বলেন, হেপাটাইটিস সি-এর জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের সাফল্য দেশের উৎপাদন সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। একই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন বায়োলজিক, টিকা এবং অন্যান্য জটিল চিকিৎসার ওষুধ তৈরিতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ইনসেপ্টা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকা, বায়োলজিক ওষুধ এবং অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উন্নয়নে কাজ করছে। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে ১০ বছর পর্যন্ত সময় নিয়েছে।

আবদুল মুক্তাদির বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করার পরিবর্তে দেশে এপিআই উৎপাদন করা গেলে উৎপাদন ব্যয় আরও কমবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়বে।

তিনি বলেন, প্রতিটি পণ্যের পেছনে আলাদা গবেষণার গল্প রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, গবেষণা মানেই নতুন কোনো অণু আবিষ্কার করা। কিন্তু এসব প্রযুক্তি এবং উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতেও বছরের পর বছর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ১৯৮২ সালের ওষুধ অধ্যাদেশের পর নেওয়া সংস্কারগুলো দেশের ওষুধশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে গত এক দশকে ওষুধের দাম নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ায় উন্নত ও নতুন ধরনের পণ্যে বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে।

তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওষুধের দাম, বিনিয়োগ এবং সরকারি নীতির প্রভাব নিয়ে কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা যে কয়েকটি দাবি করেছেন, সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসও গবেষণা এবং উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে স্কয়ার ৭০০টির বেশি জেনেরিক অণুর ভিত্তিতে ১ হাজার ৮০০টিরও বেশি ডোজ ফর্ম উৎপাদন করছে। তিনি জানান, দেশে উৎপাদিত সেমাগ্লুটাইড ও ইমাটিনিব মেসাইলেটের মতো ওষুধের দাম আমদানি করা ব্র্যান্ডেড ওষুধের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

জেনেরিকের গণ্ডি পেরিয়ে

ওষুধশিল্পের নেতাদের মতে, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের পরবর্তী প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে গবেষণা সম্প্রসারণ, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আরও জটিল ধরনের ওষুধ তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর। 

রেনাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কায়সার কবির বলেন, ২০০০ সালের শুরুর দিক থেকে উন্নত উৎপাদনমান এবং প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় দেশের ওষুধশিল্পের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এখন বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে গবেষণা, ক্লিনিক্যাল সক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রক মান পূরণের সক্ষমতা আরও জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, গত এক দশকে রেনাটা গবেষণা ও উৎপাদনে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম হাইড্রোকর্টিসোন বাজারজাত করা প্রথম কোম্পানি হয়েছে রেনাটা। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় রিভারোক্সাবান ক্যাপসুল ও জেনেরিক ক্যাবারগোলিন শূন্য দশমিক ৫ মিলিগ্রাম এবং চারটি নর্ডিক দেশে জেনেরিক অ্যামান্টাডিন ১০০ মিলিগ্রাম বাজারে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তিনি আরও বলেন, রেনাটা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের রোগের চিকিৎসার জন্য নতুন ধরনের একটি ডোজ ফর্ম তৈরি করেছে, যা বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি শিশু ও বয়স্কদের লিউকেমিয়ার চিকিৎসার জন্য নতুন একটি ওষুধের ফর্মুলেশনের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত পালবোসিক্লিব ট্যাবলেটও উৎপাদন করছে। এছাড়া বিশ্বের ৭০টি দেশে, যার মধ্যে ৬০টি কঠোর নিয়ন্ত্রিত বাজার, মোট ২৫০টি ওষুধ নিবন্ধন করেছে।

কায়সার কবির বলেন, একটি বৈশ্বিক কোম্পানিতে পরিণত হওয়ার পথ কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের তরুণ মানবসম্পদ।

 

Related Articles

Latest Posts