‘কাণ্ডারি’ রদ্রি

সবচেয়ে সফল কাণ্ডারিরা সচরাচর চড়া গলায় কথা বলেন না। তারা প্রতিটি মুহূর্তে সস্তা আলোর বৃত্তে আসতেও চান না। বরং যেখানে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়, সেখানেই নীরবে গিয়ে দাঁড়ান। বিশৃঙ্খলাকে বদলে দেন নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে। স্প্যানিশ ফুটবলের জন্য ঠিক তেমনই এক কাণ্ডারি ছিলেন রদ্রি।

অথচ এর মাত্র কয়েক মাস আগের দৃশ্যপট ছিল একদম ভিন্ন। ফুটবল বিশ্ব তখন ধোঁয়াশায়—রদ্রি কি আদৌ তার সেই পুরোনো রূপে ফিরতে পারবেন? হাঁটুর মারাত্মক ‘এসিএল’ ইনজুরি তার ক্যারিয়ার থেকে কেড়ে নিয়েছিল প্রায় ১৫টি মাস। সাইডলাইনে বসে তাকে শুনতে হয়েছে নানা গুঞ্জন—তার পায়ের গতি, মাঠে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আর ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে গেছে কি না, তা নিয়ে উঠছিল প্রশ্ন। রদ্রি অবশ্য কোনো তর্কে যাননি। তিনি শুধু নীরব থেকেছেন, সয়ে গেছেন।

‘বিশ্বকাপেই দেখা যাবে সেরা রদ্রিকে, আর পরের মৌসুমে পাওয়া যাবে তার সবচেয়ে সেরা রূপ।’- রদ্রি যখন পুনর্বাসনের কঠিন সময় পার করছিলেন, পেপ গার্দিওয়ালার এই মন্তব্যটিকে তখন ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে অন্ধ বিশ্বাসের মতোই মনে হয়েছিল অনেকের কাছে। গার্দিওলা ফুটবল বিশ্বকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু ভরসা রাখতে পেরেছিলেন খুব কম মানুষই। রদ্রি সেই সংশয়ের জবাব মুখের কথায় দেননি, দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্সে।

ম্যানচেস্টার সিটির একাদশে তিনি ফিরতেই চিত্রটা পাল্টে গেল এক লহমায়। সিটির খেলার গতি, নিয়ন্ত্রণ আর ভারসাম্য এমনভাবে ফিরল—যেন কোনো নিখুঁত যন্ত্রের হারিয়ে যাওয়া আসল কলকব্জাটি আবার যথাস্থানে বসে গেছে। তখনও রদ্রি নিজে বলছিলেন, তিনি তার সেরা ছন্দ খুঁজে ফিরছেন। অন্যদিকে, ইনজুরি তার সেই চটপটে মুভমেন্ট কেড়ে নিয়েছে কি না—তা নিয়ে চারপাশের ফিসফাস থামেনি। তবে সব দ্বিধা-সংকোচ এক ঝটকায় উড়িয়ে দিল ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’।

‘লা রোহা’দের অধিনায়ক হিসেবে রদ্রি শুধু মিডফিল্ডের ভরসাই ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন পুরো দলের মূল কাণ্ডারি। তীব্র প্রেসিং আর নান্দনিক পজেশন ফুটবলের মিশ্রণে গড়ে ওঠা স্প্যানিশ দলটির হৃৎস্পন্দন ছিলেন তিনিই। প্রতিটি আক্রমণের শুরু হতো তার হাত ধরে, রক্ষণভাগের প্রতিটি প্রতিরোধে থাকত তার ছোঁয়া। নিখুঁত পাসিং আর দূরদর্শী পজিশনিং দিয়ে তিনি ম্যাচের গতি যেমন নির্ধারণ করতেন, তেমনি সতীর্থদের নির্দেশ দিতেন কখন চেপে ধরতে হবে, কখন বল ঘুরিয়ে খেলতে হবে কিংবা কখন আক্রমণভাগে বল বাড়াতে হবে। তার এই খেলার মস্তিষ্কের ওপর ভর করেই স্বাধীনভাবে জ্বলে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন ফরোয়ার্ডরা।

রদ্রি তার সেরা রূপটা জমিয়ে রেখেছিলেন সবচেয়ে বড় মঞ্চের জন্য।

সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে পুরো মিডফিল্ড নিজের কব্জায় রেখেছিলেন রদ্রি। প্রতিপক্ষের আক্রমণ একহাতে নস্যাৎ করার পাশাপাশি স্পেনের প্রতিটি চাল পরিচালনা করে দলকে এনে দেন ২-০ গোলের সহজ জয়। আর লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ফাইনাল ম্যাচে তো উপহার দিলেন এক ফুটবল মাস্টারক্লাস!

প্রতিপক্ষের পাস কেটে দেওয়া, বলের দখল পুনরুদ্ধার, একের পর এক ডুয়েল জেতা থেকে শুরু করে স্পেনের প্রেসিং লাইনটা যেভাবে সাজিয়েছিলেন—তা ছিল অবিশ্বাস্য। খেলায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের জন্য পরিচিত আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে স্পেনের গোলপোস্টে একটিও অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি! এই দুর্দান্ত রক্ষণাত্মক সাফল্য কোনো মরিয়া ট্যাকলের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; এর ভিত্তি ছিল অগ্রিম পজিশনিং, দূরদর্শিতা আর নেতৃত্বের দৃঢ়তা। শেষ পর্যন্ত ফেরান তোরেস যখন জয়সূচক গোলটি করেন, তখন স্পেনের সেই ট্রফি জয় আসলে মিডফিল্ডে বসে পুরো ম্যাচ শাসন করা এক শান্ত মাথার নায়কেরই জয়জয়কার।

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই রদ্রির প্রভাব ছিল একচ্ছত্র। অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে তিনি বেশি স্প্রিন্ট টেনেছেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইনের ফাঁক গলে বল রিসিভ করার জন্য সবচেয়ে বেশি মুভমেন্ট করেছেন। টুর্নামেন্টের ৮টির মধ্যে ৭টি ম্যাচেই স্পেন কোনো গোল হজম করেনি, যার নেপথ্য কারিগর ছিলেন রদ্রি নিজেই।

এমন পারফরম্যান্সের পর স্বীকৃতিটা তো পাওনা-ই ছিল। স্পেনের অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বজয়ের সোনালী ট্রফিটি যেমন উঁচিয়ে ধরলেন, তেমনি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের ঝুলিতে পুরলেন মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন বল’।

ফাইন্যালের পর নিজের ক্যারিয়ারে আসা সেই চরম অন্ধকার অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে রদ্রি বলেন, ‘আপনি যখন নিচে পড়ে যাবেন, সেখান থেকেও আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।’ 

তার আশা নতুন প্রজন্ম যেন এই ফিরে আসার গল্পকে প্রতিকূলতা জয়ের এক পরম প্রেরণা হিসেবে দেখবে। 

 

Related Articles

Latest Posts