২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন ও মিত্রবাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার পর আবার কাবুলের ক্ষমতা দখল করে তালেবান। এরপর কেটে গেছে পাঁচ বছর। এই সময়ে তালেবান পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, বড় ধরনের সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করেছে এবং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটা স্থিতিশীল করেছে।
কিন্তু এই স্থিতিশীলতার আড়ালে তৈরি হয়েছে গভীর মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট। নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং দারিদ্র্য তালেবান শাসনের বড় ব্যর্থতা হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতা ধরে রাখার পাঁচ বছরে তালেবান আফগানিস্তানকে কতটা কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছে?
আজ শনিবার আল জাজিরা ও সিএনএনের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে তালেবানের সাফল্য ও ব্যর্থতার নানা দিক উঠে এসেছে।
তালেবানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রথম শাসনামলে তারা পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। এবার সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হয়নি।
আল জাজিরাতে লেখা মতামতে আফগানিস্তানের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রানজিশনাল জাস্টিস বিভাগের অধ্যাপক ওবাইদুল্লাহ বাহের বলেন, তালেবান এবার পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।
ক্ষমতায় ফেরার পর তালেবান ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রভিন্স বা আইএসকেপিকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে। আপাতত বড় কোনো সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী তালেবান সরকারের নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারছে না।
এর ফলে দেশের এমন অনেক এলাকায় এখন যাতায়াত করা সম্ভব, যেগুলো আগে নিরাপত্তাহীনতার কারণে কার্যত দুর্গম ছিল।
তবে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। আইএসকেপি ও আল-কায়েদা এখনো কিছু এলাকায় সক্রিয়। দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও দারিদ্র্যের কারণেও কিছু অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে।
তালেবান সরকার যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নিশ্চিত করতে পেরেছে, তা হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। আবার এটিই তাদের বড় দুর্বলতাও।
অধ্যাপক ওবাইদুল্লাহ বাহেরের মতে, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার হাতে ক্ষমতা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এমনকি তালেবানের নিজস্ব আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও প্রভাব হারিয়েছেন। দোহা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় থাকা এবং চুক্তি স্বাক্ষরকারী অনেক নেতাকে পরে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ফলে অল্প কয়েকজন নেতার দৃষ্টিভঙ্গিই রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাধান্য পাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতেও ব্যর্থ হয়েছে তালেবান। অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার না থাকায় রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজের বড় একটি অংশের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
আরেকটি সমস্যা হলো সরকারি অর্থব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব। এতে দুর্নীতি, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলার সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে তালেবানের সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটো দিকই আছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর বিদেশি সহায়তার বড় অংশ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তার আগে আফগানিস্তানের সরকারি ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই বিদেশি সহায়তা থেকে আসত।
অধ্যাপক ওবাইদুল্লাহ বাহের জানান, এত বড় ধাক্কার পরও তালেবান অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেয়নি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা বেড়েছে। কর ও শুল্ক আদায় বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্বও বৃদ্ধি করেছে সরকার।
প্রবাসী আফগানদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও সম্পর্ক বৃদ্ধিও অর্থনীতিতে কিছুটা গতি এনেছে বলে জানান তিনি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অগ্রগতির কথাও বলা হয়েছে। একইসঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণকে তালেবানের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
২০২২ সালে পপি চাষ নিষিদ্ধ করার পর আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদন প্রায় ৯৫ শতাংশ কমেছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরসহ বিশেষজ্ঞরা এটিকে আধুনিক ইতিহাসে অবৈধ মাদক উৎপাদনে সবচেয়ে বড় পতনগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন।
তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। আফিম চাষ গ্রামীণ পরিবারের বড় একটি আয়ের উৎস ছিল। বিকল্প জীবিকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না করেই চাষ বন্ধ হওয়ায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটির অর্থনীতি এখনো দারিদ্র্য ও সীমিত কর্মসংস্থানের চাপে রয়েছে।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়াকে অন্যতম বড় লক্ষ্য হিসেবে দেখেছিল। পাঁচ বছর পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। একমাত্র রাশিয়া ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশ তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি।
তবে বাস্তবভিত্তিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে বলে জানান অধ্যাপক ওবাইদুল্লাহ বাহের।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তালেবান সরকারের কাছে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করে চীন। এরপর আফগানিস্তানের তেল, তামা ও লিথিয়াম উত্তোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে চীনা কোম্পানিগুলো।
অধ্যাপক বাহেরের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও তালেবানের যোগাযোগ ও বাণিজ্য বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়নি তালেবান সরকার।
তবে পশ্চিমা বিশ্বের বড় অংশের সঙ্গে দেশটির দূরত্ব এখনো রয়ে গেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি নারী ও মেয়েদের ওপর বিধিনিষেধকে দায়ী করেন।
নারী ও মেয়েদের অধিকারই সম্ভবত তালেবান শাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার জায়গা।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মেয়েরা ষষ্ঠ শ্রেণির পর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে পারে না।
ইউনেসকোর হিসাবে, বর্তমানে ২৪ লাখ মেয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। বেশির ভাগ চাকরিতে নারীরা নিষিদ্ধ। জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখা এবং পুরুষ অভিভাবক ছাড়া দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের হিসাবে, অর্ধেক আফগান নারী মাসে মাত্র এক বা দুবার বাড়ির বাইরে বের হন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। সংস্থাটির হিসাবে, ১০ জনে সাতজন নারী তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ‘খারাপ’ বা ‘খুব খারাপ’ বলে বর্ণনা করছেন।
এর অর্থনৈতিক প্রভাবও বড়।
অধ্যাপক ওবাইদুল্লাহ বাহের জানান, মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ রাখার ফলে আফগানিস্তানে নারী চিকিৎসক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অথচ এসব পেশায় নারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না।
সিএনএনের প্রতিবেদনে নারীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, তালেবান সরকারের বিধানে পুরুষরা স্ত্রীকে মারধর করতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত হাড় না ভাঙে বা দৃশ্যমান ও স্থায়ী ক্ষত না হয়। নারীদের বিবাহবিচ্ছেদও কঠিন করা হয়েছে এবং বিয়ের ন্যূনতম ১৬ বছরের বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।
এতে বাল্যবিবাহ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।
নারীদের মতো আফগান শিশুরাও তালেবান আমলে বড় সংকটে রয়েছে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের বরাতে সিএনএন জানায়, প্রতি ১০ শিশুর একজন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। একই সময়ে ইউনিসেফের হিসাবে, চলতি বছর ১ কোটি ১০ লাখের বেশি শিশুর মানবিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মানও কমেছে। যোগ্য শিক্ষক তৈরি ও তাদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর বিপরীতে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যাপকভাবে কমেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের তুলনায় আফগানিস্তানের মানবিক সহায়তার অর্থায়ন প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। দেশটির প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে ১ কোটি ৭ লাখের বেশি নারী ও মেয়ে সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্র একসময় আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় সহায়তাদাতা হলেও এখন শীর্ষ পাঁচ দাতার মধ্যেও নেই। ২০২৫ সালে আফগানিস্তানে ইউএসএআইডির প্রায় সব চুক্তি বাতিল হলে ১৭০ কোটি ডলারের বেশি পরিকল্পিত সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়।
অধ্যাপক ওবাইদুল্লাহ বাহেরের মতে, একটি রাষ্ট্র শুধু নিরাপত্তা ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ দিয়ে চলে না। পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলেও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারেনি। বিশেষ করে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী ও মেয়েরা যখন নানা ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তখন এই ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক বিদ্রোহের চেয়ে ধীরে ধীরে জমতে থাকা জনঅসন্তোষ ও বিচ্ছিন্নতাকেই বড় ঝুঁকি মনে করছেন অধ্যাপক বাহের।
তার মতে, একটি সরকার দীর্ঘদিন বিরোধীদের দমন করে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন সরকারের ওপর আস্থা হারায়, তখন সেই স্থিতিশীলতা ভঙ্গুর হয়ে উঠতে পারে।
