ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার বরাতে এ তথ্য জানায় বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
আজ শনিবার ভোরে ভূমিকম্পের পর বেশ কয়েকটি আফটারশক অনুভূত হয়।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের সবচেয়ে কাছের এলাকা নাগেকেওতে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। ভূমিধসে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
পূর্ব নুসা তেংগারার তালিবুরা গ্রামের ৫১ বছর বয়সী বাসিন্দা নোনা বলেন, ‘ভূমিকম্পটি ছিল ভয়াবহ। কম্পন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে আমরা সবাই বাইরে বেরিয়ে আসি। ঘরের ভেতর সেমময় ১৩ জন ছিলাম। সবাই নিজেদের বাঁচাতে দৌড়ে বেরিয়ে যাই।’
ভূকম্পনের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রটির বেশকিছু এলাকায় ১ মিটারের কম উচ্চতার সুনামি ঢেউ রেকর্ড করা হয়। তবে ভূমিকম্পের প্রায় তিন ঘণ্টা পর সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
শহরটির উদ্ধার সংস্থার প্রধান ফাতুর রহমান বলেন, এর আগে বন্দরনগরী মাউমেরে উদ্ধারকারীরা ২০ জনের মরদেহ, ছয়জন আহত ব্যক্তি এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা দুজনকে উদ্ধার করেন। পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের সিক্কা রিজেন্সির প্রধান শহর মাউমেরে।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান সুহারিয়ান্তো এর আগে জানিয়েছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বিভিন্ন ভবনে বাসিন্দারা আটকে রয়েছেন। এছাড়া কয়েকটি সড়ক ভূমিধসে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, নাগেকেওর প্রায় ২ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাড়িঘর, গুদাম ও সরকারি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রিজেন্সিটির বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও যানজটের কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের গভর্নর ইমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ঘুমের মধ্যে ভবন ধসে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫৭টি বাড়ি ব্যাপকভাবে, ৪১টি মাঝারি মাত্রায় এবং ১৪৮টি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৮৭টি স্কুল, ১৮টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, পাঁচটি উপাসনালয় ও ছয়টি অফিস ভবনসহ অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, পূর্ব নুসা তেংগারা, পশ্চিম নুসা তেংগারা এবং দক্ষিণ সুলাওয়েসির কিছু এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে। কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা প্রায় এক মিনিট ধরে কম্পন অনুভূত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অধিকাংশ মানুষ কম্পন অনুভব করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন দিকে ছুটে যান।
রয়টার্সের যাচাই করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পূর্বাঞ্চলীয় ফ্লোরেস দ্বীপের সিক্কা রিজেন্সির প্রধান শহর মাউমেরেতে একটি ভবনের অংশ ধসে ধুলো ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এ সময় আতঙ্কিত মানুষ চিৎকার করতে করতে রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে আসেন।
মাউমেরে বন্দরের কাছে পরিবারের সঙ্গে বসবাসকারী ৩৭ বছর বয়সী সিতি সালফিয়া বিরা বলেন, কম্পন শুরু হলে আমি দ্রুত উঁচু এলাকায় চলে যাই।
তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা বাড়ি ফিরতে সাহস পাচ্ছি না, কারণ পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। আরও কম্পন হতে পারে, এ নিয়ে আমরা এখনো উদ্বিগ্ন।’
ইন্দোনেশিয়ার ভূতত্ত্ব সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৫৮ মিনিটে ভূ-পৃষ্ঠের ১৫ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এরপর কয়েকটি আফটারশক অনুভূত হয়।
বিএমকেজি জানিয়েছে, ১৯৯২ সালে একই এলাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র জানিয়েছে, সমুদ্রের তলদেশে সংঘটিত এই ভূমিকম্পে ‘অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড, দ্বীপ বা অঞ্চলগুলোর জন্য কোনো সুনামির ঝুঁকি নেই’।
ইন্দোনেশিয়া ভূমিকম্পপ্রবণ ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত। টেকটোনিক প্লেটগুলোর মিলনস্থল হওয়ায় এই এলাকায় প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।
২০১৮ সালে সুলাওয়েসি দ্বীপের পালু শহরে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামি আঘাত হানে। এতে ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
