গভীর সুড়ঙ্গ থেকে নেপালি ২ শ্রমিককে যেভাবে উদ্ধার

নেপালের ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের গভীর সুড়ঙ্গ থেকে নয় দিন পর দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা দেশটিতে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। আজ শুক্রবার ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে সঞ্জয় শাহ ও কবির মহার্জনকে উদ্ধার করা হয়।

দুই শ্রমিককে উদ্ধারের পেছনে ছিল দীর্ঘ ও জটিল অভিযান। বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উদ্ধারকারীদের প্রথমে সুড়ঙ্গের অবস্থান শনাক্ত করে সেখানে পৌঁছাতে হয়, এরপর ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ভেতরে ঢোকার পথ তৈরি করতে হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে পৌঁছাতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন লেগে যায়। বন্যার পর সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়েছিল। উদ্ধারকারীরা বিশাল পাথর ও কাদা সরাতে খননযন্ত্র ব্যবহার করেন।

সুড়ঙ্গের ভেতরে কেউ আটকা পড়ে থাকলে যাতে অক্সিজেনের অভাবে মারা না যান, সেজন্য জীবিতদের সম্ভাব্য অবস্থানগুলোতে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহের চেষ্টাও করা হয়।

এরপর শুক্রবার উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ক্ষীণ সাড়া পাওয়ার কথা জানান। অস্ট্রেলিয়ার উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স এএফপিকে বলেন, উদ্ধারকারীরা ভেতরে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করছি।’ এর জবাবে ভেতর থেকে নেপালি ভাষায় ‘হুঞ্চা’ অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ বা ‘ঠিক আছে’ শোনা গেছে বলে তারা ধারণা করেন।

এতে উদ্ধারকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়। ডিক্স জানান, সুড়ঙ্গের মুখে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিটার সরানো হয়েছিল। এর এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে দুই শ্রমিককে জীবিত বের করে আনতে সক্ষম হন উদ্ধারকারীরা।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, কাদায় ভরা একটি সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে উদ্ধারকারীরা প্রথম শ্রমিককে বের করে আনছেন। তাকে দাঁড়াতে সহায়তা করার পর একপর্যায়ে উদ্ধারকারীদের পিঠে করে হেলিকপ্টারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় তিনি হাত উঁচিয়ে সাড়া দিচ্ছিলেন।

অপর শ্রমিক কবির মহার্জনকে কাদায় মাখা অবস্থায় স্ট্রেচারে করে বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা। উদ্ধারের সময় তার দুই হাত ছিল প্রার্থনার ভঙ্গিতে।

দুই শ্রমিকের একজন সঞ্জয় শাহ মেকানিক্যাল ফোরম্যান এবং কবির মহার্জন মেকানিক্যাল সুপারভাইজার। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সঞ্জয়ের অবস্থা স্থিতিশীল। কবিরকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।

উদ্ধারের পর সঞ্জয় জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি প্রকল্পের কন্ট্রোল রুমে ছিলেন। অন্যদের নিরাপদে বের করে দিতে গিয়ে তিনি নিজে বের হতে পারেননি। সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকার সময় তিনি একটি মন্ত্র জপ করে সময় কাটান।

সঞ্জয় জানান, তার আশপাশে তিন-চারজনের সঙ্গে কথা বলা বা শব্দ করে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছিল। তবে সুড়ঙ্গটি দীর্ঘ হওয়ায় আরও মানুষ ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা তার।

এই উদ্ধার অভিযান সফল করতে শুধু ভারী যন্ত্রপাতিই নয়, প্রকল্পের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে প্রকৌশলীদের জ্ঞানও কাজে লাগানো হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার পর প্রকৌশলীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ উদ্ধার অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কেন্দ্রে পরিণত হয়।

গ্রুপটিতে ৫০০-এর বেশি সদস্য ছিলেন। উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গের নকশা ও প্রবেশপথের তথ্য চাইলে প্রকৌশলীরা সেগুলো হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতেন। এমনকি নিখোঁজ শ্রমিকদের নাম ও মোবাইল নম্বরও সেখানে শেয়ার করা হয়, যাতে তাদের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্তে টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া যায়।

রয়টার্স জানিয়েছে, বন্যার পানিতে পুরো উপত্যকায় প্রায় ২২ লাখ টন কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমেছে। ফলে অনেক সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত বলেন, বন্যায় সুড়ঙ্গের চারপাশের ভূখণ্ড ও ভেতরের কাঠামো বদলে গেছে। কাদা, পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সুড়ঙ্গের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। এটি সাধারণভাবে সুড়ঙ্গ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নয়।

গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তের পাহাড়ে হিমবাহ ও শিলাধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ত্রিশূলি উপত্যকার একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ১২টি প্রকল্প বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয়টি প্রকল্প থেকে প্রায় ৯০০ মানুষ নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

দুই শ্রমিককে উদ্ধারের আগে কোনো সুড়ঙ্গ শ্রমিকের জীবিত থাকার খবর নিশ্চিত করা যায়নি। তাই শুক্রবারের উদ্ধার অভিযানকে ‘অলৌকিক’ বলে অভিহিত করেছেন উদ্ধারকারীরা।

অস্ট্রেলিয়ার উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স বলেন, এক সপ্তাহের ‘দিন-রাতের হৃদয়বিদারক’ প্রচেষ্টার পর উদ্ধারকারীরা আবার ‘অলৌকিক ঘটনার দেশে’ ফিরে এসেছেন।

তবে ত্রিশূলি-৩এসহ অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গেও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। নেপাল সরকার এর আগে জানিয়েছিল, একাধিক সুড়ঙ্গে ১০০ জনের বেশি শ্রমিক জীবিত থাকতে পারেন।

Related Articles

Latest Posts