ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার শনিবার মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তিন ঘণ্টা ১০ মিনিট বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষই বড় ধরনের অগ্রগতির কথা জানায়নি।
ক্রেমলিনের প্রেসিডেন্ট বিষয়ক সহযোগী ইউরি উশাকভ বৈঠকটিকে ‘গঠনমূলক, অত্যন্ত খোলামেলা ও আস্থাপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, আলোচনায় ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য পথ নিয়ে মার্কিন দূতেরা বেশ কিছু ধারণা তুলে ধরেছেন। তবে সেসব প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করেননি তিনি।
উশাকভ বলেন, বৈঠকটি শুধু ইউক্রেন সংকট সমাধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সম্ভাব্য বড় পরিসরে রুশ-মার্কিন অর্থনৈতিক প্রকল্প ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
এএফপি জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বৈঠকটিকে ‘অর্থবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, যুদ্ধ বন্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে দুই পক্ষ বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোচনা করেছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেসব পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হবে।
বৈঠকের শুরুতে পুতিন ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত সমাধানে কাজ করে যাচ্ছেন এবং সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার চেষ্টা করছেন।
পুতিন আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনেও তাদের সফরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে রাশিয়া। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, মার্কিন দূতদের সফরকে সামনে রেখে পুতিন কিয়েভে তিন দিনের জন্য হামলা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ
রুশ সংবাদমাধ্যম তাস বলছে, আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে মস্কো ও কিয়েভ দুই পক্ষই কয়েক দিনের জন্য একে অপরের রাজধানীতে হামলা না চালানোর ঘোষণা দেয়।
পেসকভ জানান, রোববার মধ্যরাত থেকে তিন দিনের জন্য কিয়েভে হামলা না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন পুতিন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও জানান, শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত মস্কোয় হামলা না চালানোর জন্য কিয়েভ প্রস্তুত।
তবে সীমিত এই যুদ্ধবিরতির মধ্যেও রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। জেলেনস্কি জানান, শনিবার দেশজুড়ে রুশ হামলায় ১০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে খারকিভ অঞ্চলে এক শিশু ও তার পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।
জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, মার্কিন দূতদের সফর ব্যাহত করতে মস্কো কিয়েভের দুটি বিমানবন্দর ও বেসামরিক স্থাপনায় রাতভর হামলা চালিয়েছে।
দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে
যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের আরও ভূখণ্ড দখল করার লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি রাশিয়া।
ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেন, দোনেৎস্ক অঞ্চলের বাকি অংশ দখল না করা পর্যন্ত পুতিন যুদ্ধের সম্মুখসারির বিষয়ে কোনো সমঝোতায় যেতে আগ্রহী নন। তার দাবি, রুশ নেতৃত্বের ধারণা বছর শেষ হওয়ার আগেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
তবে পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকেরা এমন সম্ভাবনাকে দূরবর্তী বলে মনে করছেন। ইউক্রেনও যুদ্ধ করে ধরে রাখা ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে রাজি নয়। কিয়েভের মতে, এ ধরনের শর্ত কার্যত আত্মসমর্পণের সমান।
ক্রেমলিন শুক্রবারও জানিয়েছে, দুই বছর আগে পুতিন যে অবস্থান নিয়েছিলেন—ইউক্রেনকে রাশিয়ার দাবিকৃত চার অঞ্চলের পুরো ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে হবে—সেটি এখনো ‘অপরিবর্তনীয়’।
মস্কো থেকে কিয়েভে ট্রাম্পের দূতেরা
মস্কো সফরের পর উইটকফ ও কুশনার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উদ্দেশে রওনা হন। রোববার ভোরে তারা পোল্যান্ডের রেজেসজফ শহরে পৌঁছান বলে দেশটির একটি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়। সেখান থেকে তাদের রেলপথে কিয়েভ যাওয়ার কথা।
ইউক্রেনের আকাশসীমা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই বন্ধ। ফলে বিদেশি নেতারা সাধারণত ট্রেনে করে কিয়েভে প্রবেশ করেন।
জেলেনস্কি জানান, তিনি রোববার মার্কিন দূতদের সঙ্গে বৈঠকের অপেক্ষায় ছিলেন।
উইটকফ ও কুশনারের মস্কো সফরটি ছিল যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় তাদের অষ্টম সফর। তবে কিয়েভে এটিই তাদের প্রথম সফর হতে যাচ্ছে।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেছিলেন, তার দূতেরা যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি নতুন ‘প্রস্তাব’ নিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি প্রস্তাবটির বিস্তারিত জানাননি। এখন মস্কোর আলোচনার পর কিয়েভে মার্কিন দূতদের বৈঠক যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে নতুন কোনো অগ্রগতি আনতে পারে কি না, সেদিকেই সবার নজর।
