জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার সীমান্তবর্তী যমুনার চরাঞ্চলে চাঁদা না দিলে কাশবনে গরু-মহিষ চরাতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, চাঁদা না দিলে বাথানমালিক ও রাখালদের ওপর জুলুম-নির্যাতন, গরু-মহিষ লুট ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। তৃণভূমির দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষ হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সারিয়াকান্দির পাকুরিয়া চরে কাশবনের দখলকে কেন্দ্র করে এই সিন্ডিকেটের এক নেতা মুসলেম উদ্দীনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর চরাঞ্চলের তৃণভূমি দখল ও চাঁদাবাজির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অপর একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন গিয়াস খান ও হায়দার খান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, মুসলেম উদ্দীনের সিন্ডিকেটটি ‘আওয়ামী লীগের সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। তিনি পাকুরিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। মুসলেম নিহত হওয়ার পর তার গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহজাহান।
অন্যদিকে, গিয়াস ও হায়দার খানের সিন্ডিকেটটি ‘বিএনপির সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। তারা মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঞ্জুর কাদের বাবুল খানের চাচাতো ভাই।
মাদারগঞ্জের একাধিক গরু-মহিষের মালিক জানান, প্রতিবছর উপজেলার প্রায় ২০-৩০ হাজার গরু-মহিষ যমুনার চরাঞ্চলে নেওয়া হয়। এসব এলাকায় শত শত রাখাল অবস্থান করেন।
রবিন মিয়া নামের এক রাখাল ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখানে বিঘাপ্রতি দেড় থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে আমরা মহিষ চরাই। টাকা না দিলে অপহরণ বা মহিষ চুরি করে নিয়ে যায়।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক রাখাল বলেন, ‘মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে তৃণভূমির দখলকে কেন্দ্র করে কয়েকটি চক্র বাথানমালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা না দিলে রাখাল অপহরণ ও গরু-মহিষ লুটের ঘটনাও ঘটছে।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সারিয়াকান্দির কাজলা ইউনিয়নের চর ঘাঘুয়া এলাকা থেকে মাদারগঞ্জের কয়েকজন মহিষ মালিকের বাথান থেকে চার রাখালকে অপহরণ করা হয়। পরে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে পাবনার রূপপুর এলাকা থেকে তাদের ছাড়িয়ে আনা হয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাথানমালিক বলেন, ‘আমার বাবা-দাদারাও এই নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলেই মহিষ চরাতেন। কিন্তু কখনো চাঁদা দেননি। তবে গত দুই বছরে কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লোক নয়। এসব সিন্ডিকেটে সব দলের লোকই আছে।’
এদিকে, সম্প্রতি তৃণভূমি নিয়ে বিরোধ, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি বন্ধে সম্প্রতি কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম একটি বৈঠকের আয়োজন করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা বৈঠক করে কীভাবে এ সমস্যা সমাধান করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, বিএনপির কেউ এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত নন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঞ্জুর কাদের বাবুল খান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের সঙ্গে আমার চাচাতো ভাইয়েরা জড়িত নন। তাদের ফাঁসানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য ইউপি সদস্য শাহজাহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মাদারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরাও এ ধরনের অভিযোগের কথা শুনেছি। তবে লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তারা নিজেরাই পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করে নেন।’
সারিয়াকান্দি থানার ওসি আ ফ ম আছাদুজ্জামান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মুসলেম উদ্দীন হত্যা মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি এখন ডিবি তদন্ত করছে।’
চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। তবে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।’
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি ওসিকে বিশেষভাবে বলে রাখব। বিষয়টি দেখার জন্য।’
সারিয়াকান্দির ইউএনও এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। ওই চর এলাকার এ সমস্যা সম্পর্কে এখনো অবগত নই। তবে এ রকম কোনো সমস্যা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’
জানতে চাইলে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন ইউএনও। তার সঙ্গে কথা বলেন।’
