মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সর্বত্র। খাবার পানি থেকে শুরু করে চিকেন নাগেটস—সব ধরনের খাবারেই এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে এই দূষণকারী উপাদানের সঙ্গে হৃদরোগ, ফুসফুসের জটিলতা এবং আরও বেশ কিছু উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
মানুষের শরীরে যাতে এসব ক্ষতিকর কণা প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সুপারিশ অনুযায়ী বেশকিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছে সংবাদ মাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।
বিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হলেও এর সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রধানত পানি, খাদ্য ও বাতাস থেকে আসা মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানোর দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বোতলজাত পানি মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি বড় উৎস। ২০১৯ সালের এক সমীক্ষায় সাধারণ খাবার ও পানীয়ের মধ্যে বোতলজাত পানিকেই সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গড়ে বোতলজাত পানিতে কলের পানির চেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে।
জরুরি প্রয়োজনে বোতলজাত পানি পানে বড় ক্ষতি না হলেও সাধারণ সময়ে বাইরে বের হলে স্টিল বা কাচের বোতল সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্লাস্টিক বোতলের বদলে কলের পানি পান করলে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার হার অনেকটাই কমে যায়।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কলের পানিতেও কিছুটা মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে।
এর জন্য ল্যাবে পরীক্ষিত ও সরকার অনুমোদিত ফিল্টার ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে ফিল্টারগুলো কেবল প্লাস্টিকের মাত্রা কমাতে পারে, পুরোপুরি দূর করার নিশ্চয়তা দেয় না।
ফিল্টারের প্লাস্টিক থেকে কণা ঝরে পড়া রোধ করতে গরম পানি ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে ফ্রিজে পানি সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে তারপর ফিল্টারে ব্যবহার করলে, তা মাইক্রোপ্লাস্টিক কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার বা পানীয় সংরক্ষণ এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ।
তাদের মতে, যেসব প্লাস্টিকের পাত্রে ‘মাইক্রোওয়েভ সেইফ’ লেখা রয়েছে, সেসব পাত্রও উচ্চ তাপ, সূর্যালোক বা অ্যাসিডের সংস্পর্শে আনা উচিত নয়।
বাড়িতে খাবার রাখা বা গরম করার ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচের পাত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পাত্র পুনরায় ব্যবহার না করার পরামর্শ তাদের।
একইসঙ্গে প্লাস্টিকের কনটেইনার বা কৌটা, ব্রেস্টমিল্ক ব্যাগ বা পানির বোতল ধুয়ে পুনরায় খাবার রাখার কাজে ব্যবহার বন্ধ করতে বলেছেন তারা।
মাইক্রোওয়েভে বা চুলায় প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার বা পানি (যেমন, কিছু প্লাস্টিকযুক্ত টি-ব্যাগ ফোটানো) গরম করা বন্ধ করুন।
‘মাইক্রোওয়েভ সেইফ’ লেখা পাত্রও তাপ থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর বদলে কাচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করতে বলেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডিশওয়াশারের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে, যা প্লাস্টিক ক্ষয় করে এবং এটি মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষরণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
তাই প্লাস্টিকের পাত্র সাধারণ পানি দিয়ে ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডে ছুরি দিয়ে বারবার কাটার ফলে প্লাস্টিকের সূক্ষ্ম কণা উঠে গিয়ে খাবারে মিশে যেতে পারে।
এ কারণে কাঠ বা বাঁশের তৈরি কাটিং বোর্ড ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, যদি প্লাস্টিকের বোর্ড ব্যবহার করতেই হয়, তবে তা যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করা এবং বেশি দাগ পড়ে গেলে বদলে ফেলাই নিরাপদ।
ধূলিকণার মাধ্যমে বাতাস থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ঘর নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং ভিজা কাপড় দিয়ে আসবাবপত্র মোছার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর পাশাপাশি ফ্যান ও এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার এবং প্রয়োজনে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহারের পরামর্শ তাদের।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বায়ু, পানি ও খাবারের সঙ্গে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক শতভাগ এড়ানো অসম্ভব। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের সার্বিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াসহ দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও সংস্পর্শ সচেতনভাবে কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
