বিজয়ী দলের উদযাপন মঞ্চের পেছনে বড় হরফে জার্মানিতে লেখা—‘আলেস ইস্ট ম্যোগলিখ’—অর্থাৎ, ‘সবকিছুই সম্ভব’।
অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর ৮১ বছর পর উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ‘আলটারনেটিফে ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড’ বা এএফডি সেই ‘সবকিছুই সম্ভব’ বার্তাটির প্রতিফলন দেখালো জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে বৃহত্তম দল হিসেবে বিজয়ী হয়ে।
জার্মানির ১৬ রাজ্যের মধ্যে ভৌগোলিকভাবে অষ্টম বৃহত্তম ও জনসংখ্যার দিক থেকে ১১তম রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্ট। সেই রাজ্যের নির্বাচনে কট্টর জাতীয়তাবাদীদের বিজয় উল্লাসে যেন কেঁপে উঠেছে পুরো ইউরোপ।
এএফডির এমন বিজয়ে দুই মহাযুদ্ধের ক্ষেত্রভূমি শিল্পোন্নত এই মহাদেশটি যেন দেখতে পাচ্ছে ‘হিটলারের ছায়া’।
গত ৬ সেপ্টেম্বর স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে এএফডি রাজ্যের পার্লামেন্টে বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই রাজ্যে দলটির প্রধান প্রার্থী ও পার্লামেন্টে নির্বাচিত সদস্য উলরিশ সিগমুন্ড বিজয়ী ভাষণে জানান, তারা ইতিহাস গড়েছেন। তারা আবার তাদের দেশ দখলে নেবেন। স্যাক্সনি-আনহাল্ট দিয়ে এই যাত্রা শুরু।
এ কথা সবাই জানেন যে, ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি পার্টি হিসেবে বহুল পরিচিত ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে। জার্মান ‘জাত্যভিমান’ জাগিয়ে তোলা দলটি ১৯৪৫ পর্যন্ত সেখানে একদলীয় শাসন চালিয়েছিল। শুধু তাই নয়, একের পর এক প্রতিবেশী দেশগুলোয় চালিয়েছিল আগ্রাসন।
জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি হিসেবে গড়ে উঠা নাৎসি পার্টির জন্ম ১৯১৯ সালে। সেই বছর হিটলার সেই পার্টির এক সভায় যোগ দিয়েছিলেন। পরের বছর দলের নাম বদলে রাখা হয় ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি।
সমাজবাদী ধারণা দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। এরপর জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে ধীরে ধীরে হিটলার দলটিতে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। সেসময় দলের লোকদের রক্ষায় শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীও গড়ে তোলা হয়েছিল।
১৯২১ সালে দলের অন্যান্য নেতাদের সরিয়ে হিটলার সমাজতান্ত্রিক দলটির প্রধান হয়ে উঠেছিলেন।
১৯২৩ সালে নাৎসি পার্টি দেশটির দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বাভারিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ায় সাময়িকভাবে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ১৯২৪ সালে জেল খেটেছিলেন হিটলার।
এ কথাও সবাই জানেন যে—১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর হাতে হিটলারের বাহিনী তথা জার্মানির পরাজয়ের পর ইউরোপে যেন উগ্র জাতীয়তাবাদী দল গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য ন্যাটো সামরিক জোট গঠন করা হয়েছিল।
ন্যাটোর উদ্দেশ্য—সব সদস্য দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়—ন্যাটোর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরা। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা। তথ্য আদানপ্রদান করা। বিশ্বাস জাগানো। সমস্যার সমাধান। সংঘাত রুখে দেওয়া।
জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচন নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিবিসির এক ভিডিও প্রতিবেদনে সেই এলাকায় এএফডির এক রাজনৈতিক সমাবেশে এক সমর্থককে ‘আরিখ’ লেখা টি-শার্ট পরতে দেখা যায়।
জার্মান ভাষায় ‘আরিখ’ শব্দের অর্থ ‘আর্য’। প্রতিবেদন অনুসারে—এই শব্দটি নাৎসিরা ব্যবহার করতো নিজেদের ‘সেরা জাতির মিথ্যা ভাবনা’ তুলে ধরতে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসের এক সংবাদ বিশ্লেষণের শিরোনামে বলা হয়, ‘জার্মানির এক রাজ্যে অতি-ডানপন্থিদের বিজয়কে ইউরোপ দেখছে অশুভ ইঙ্গিত হিসেবে।’
এতে বলা হয়, জার্মানির এক ছোট রাজ্যে অতি-ডানপন্থি এক দলের বিজয় উল্লাসের কম্পন লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিট ও প্যারিসের এলিস প্রাসাদে এসে লেগেছে। শুধু তাই নয়, জার্মানির দলটির অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যে উৎসাহ পাচ্ছে স্পেন ও ইতালিসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশের উগ্রবাদী দলগুলো।
কেন ইউরোপ জার্মানির এএফডিকে এত ভয় পাচ্ছে?—ইন্টারনেটে এমন প্রশ্নের খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেল নানান তথ্য।
গত ৯ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের মাগদেবুর্গ শহরের কয়েকজন বাসিন্দার আশঙ্কাকে তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনটিতে সেই জার্মান শহরের নানা বয়সী বাসিন্দাদের মতামত তুলে ধরা হয়। শহরটির ৮৮ বছর বয়সী অধিবাসী জুডিথ তার শরণার্থী জীবনের গল্প তুলে ধরে বলেন, ১৯৪৬ সালে ৮ বছর বয়সে তাকে জোর করে পোল্যান্ড থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মাগদেবুর্গ শহরে আসেন।
এর ফলে তার জীবনবোধ পাল্টে যায় বলে জানান এই বর্ষীয়ান প্রকৌশলী ও রাজনীতিক। স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থি রাজনৈতিক দল এএফডির ভালো ফল করাকে তিনি ‘হৃদয়বিদারক’ বলে মন্তব্য করেন।
সেই এলাকার অপর বাসিন্দা ৭১ বছর বয়সী ফ্রানজ-ইয়োসেফ বলেন—জার্মানির নাৎসি ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে হয় এএফডির এই বিজয় একটি ‘বিপর্যয়’।
তবে ৩৪ বছর বয়সী লুইসা মনে করেন, এএফডির বিজয় জার্মানির ক্ষমতাসীনদের জন্য এক ‘কঠোর বার্তা’। কেননা, বর্তমান সরকার দেশটির অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটাতে ব্যর্থ হয়েছে।
এএফডি যে জার্মানির অর্থনৈতিক সমস্যা দূর করতে পারবে তাও মনে করেন না তিনি।
এএফডির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে—দলটি জার্মানি থেকে ‘অনিবন্ধিত অভিবাসীদের’ তাড়িয়ে দেবে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর টাইম ম্যাগাজিন ‘দ্য এএফডি’স ডার্ক এজেন্ডা ফর জার্মানি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়—দলটির ২৫৮ পৃষ্ঠার ইশতেহারে আছে তাদের লক্ষ্য ‘সবার আগে দেশ’। যারা দেখতে ‘জার্মান’ নন, বা যারা ‘জার্মানদের মতো’ কথা বলেন না, তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে।
দীর্ঘদিন ধরে জার্মানিতে থাকা ব্যক্তিরাও এই তালিকায় পড়তে পারেন।
এএফডি দেশটির ইতিহাস শিক্ষায় ‘বিসমার্ককে বেশি ও হিটলারকে কম গুরুত্ব দেবে’। জার্মান সাম্রাজ্যের সফলতা ও রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে নাৎসিবাদ ও হলোকাস্ট বা ইহুদিনিধন-কেন্দ্রিক আলোচনার গুরুত্ব কমিয়ে আনা হবে।
জার্মান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক (১৮১৫-১৮৯৮) ইউরোপের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন বহুধা বিভক্ত জার্মান জাতিকে একত্র করার জন্য। অনেকে তাকে জার্মান জাতির ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে সম্মান করেন। তার নেতৃত্বে একত্রিত জার্মানি ইউরোপে একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল।
তাই বিসমার্ককে অনুসরণ করে জার্মানিকে আবারও ‘শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রে’ পরিণত করতে চায় এএফডি।
গত ৭ সেপ্টেম্বর সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এএফডি হুঁশিয়ারি দিচ্ছে—‘অভিবাসীদের গণহারে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে’। এতে আরও বলা হয়, দলটি শরণার্থীদের জন্য পৃথক বিদ্যালয় গড়ে তুলবে। জার্মানদের ‘দেশপ্রেমী’ করে গড়ে তুলতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এএফডি জার্মানির অর্থনৈতিক অবস্থা ফেরানোর চেষ্টা করবে। তারা রাশিয়া থেকে কম দামে জ্বালানি নেওয়ার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উদ্যোগ নেবে।
বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়—এএফডির এমন উগ্র-জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দাওয়াই জার্মানির বাসিন্দাদের আকৃষ্ট করছে।
গত ৭ আগস্ট জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে যে দেশটির অন্তত ২৮ শতাংশ ভোটার এএফডিকে ভোট দিতে আগ্রহী।
দ্বিতীয় অবস্থানে আছে দেশটির চ্যান্সেলর বা সরকারপ্রধান ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের মধ্য-ডানপন্থি ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) ও এর সহযোগী দল দেশটির দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় বেভারিয়া অঞ্চলের ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন (সিএসইউ)। এই দুই দলকে সমর্থন করছেন ২১ শতাংশ ভোটার।
সিএনএনের সেই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে—জার্মানির সংস্কৃতিমন্ত্রী ভলফ্রাম ভেইমার সংবাদ সংস্থা এপি-কে বলেছেন, ‘ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এএফডি এমন শব্দ ব্যবহার করছে যা ১০০ বছর আগে নাৎসিরা ব্যবহার করতো।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে জার্মানিতে নাৎসিদের পতনের ৮১ বছর পর আবারও ‘নাৎসি’ শব্দটি সারা দুনিয়ায় আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে, স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে এএফডির বিজয়ের পর এ নিয়ে এত বেশি আলোচনা হচ্ছে যে তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে ইউরোপ। সেই মহাদেশীয় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও।
ব্রিটানিকা বলছে—নাৎসিবাদ হচ্ছে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানিতে নাৎসি পার্টির একদলীয় শাসনব্যবস্থা। ইতালির ফ্যাসিবাদের সঙ্গে এর মিল আছে।
সবদিক থেকে নাৎসিবাদকে মুক্তচিন্তাবিরোধী হিসেবে উল্লেখ করে এতে আরও বলা হয়, স্বৈরশাসকের ইচ্ছাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনিই জনগণের সব প্রেরণার একক উৎস।
আর্য জাতির সব শত্রুদের নির্মূল করার চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া নাৎসি পার্টির একমাত্র লক্ষ্য।
ব্রিটানিকার তথ্য আরও বলছে—নাৎসিবাদ একটি উগ্র আদর্শ। এই মতবাদে যুক্তি, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শান্তিসহ সব ধরনের ইতিবাচক মূল্যবোধকে খারিজ করে দেওয়া হয়।
‘সব মানুষ সমান’—এমন আদর্শ নাৎসিবাদের অনুসারী বা নাৎসিরা মানে না। তারা আর্য জাতিকে পৃথিবীর সেরা জাতি মনে করে এবং কেবল পরিপূর্ণ আর্যদেরকেই সত্যিকারের জার্মান গণ্য করে।
অথচ, নিজেদের আর্য দাবি করা আরও বেশ কয়েকটি জাতিগোষ্ঠী বেশ সুপরিচিত। যেমন ইরান ও আয়ারল্যান্ড। এই শব্দ দুটিও এরিয়ান বা আর্য থেকে উদ্ভূত।
তাই অনেক বিশ্লেষক বলেন, নিজেদের আর্য দাবি করার একমাত্র অধিকার শুধু জার্মানদের নয়। যদিও হিটলার ‘আর্য’ শব্দটি শুধু জার্মানদের বোঝাতে ব্যাপকহারে ব্যবহার করেছেন।
তাই জার্মানির নাৎসি বা নাৎসিবাদীরা মনে করে, যেহেতু তারা ‘সেরা জাতি’ তাই অন্য দেশ শাসন করার অধিকার তাদের আছে।
এমন অনেক ভাবনা দেখা যায় জার্মানিতে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এএফডির নেতা-সমর্থকদের মধ্যে। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে এই দলকে ‘নব্য-নাৎসি’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
গত ১৭ আগস্ট ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে জানানো হয়—‘জার্মানির এএফডিকে উগ্র-ডানপন্থি, জনতুষ্টিবাদী অথবা চরমপন্থি হিসেবে দেখা হয়’।
এতে আরও জানানো হয়, অনেকেই এএফডিকে ‘উগ্র ডানপন্থি চরমপন্থি দল’ হিসেবে গণ্য করেন। উগ্র ডানপন্থি দলগুলো মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ ও একনায়কের শাসনের কথা বলে। তারা উদার ও বহুত্ববাদী সমাজের বিরোধী।
তবে জার্মানির ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপলাইড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সায়েন্সেসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরমিন ফাহল-ট্রাউগবার মনে করেন, উগ্র ডানপন্থিরা যে গণতন্ত্রবিরোধী হবেন এমন কোনো কথা নেই।
তিনি এএফডি-কে ‘চরম উগ্র ডানপন্থি’ বলতে বেশি পছন্দ করেন।
তার ভাষ্য: ‘যারা আধুনিক গণতন্ত্রের মৌলিক বিষয় যেমন—গণতন্ত্র, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার ও বহুত্ববাদকে খারিজ করেন; আবার নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন, আমার মতে—তারা চরম উগ্র ডানপন্থি।’
গত ২৫ আগস্ট ডয়েচে ভেলের অপর এক প্রতিবেদনে এএফডির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ‘অগ্নিবলয়’ গড়ে তোলার তথ্য জানানো হয়। এতে আরও জানানো হয়, জার্মানির রাজনীতিতে এএফডির বিরুদ্ধে ‘অগ্নিবলয়’ শব্দটি জনপ্রিয় করেছেন দেশটির চ্যান্সেলর ও সিডিইউ দলের নেতা ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস।
প্রতিবেদন অনুসারে—২০২১ ম্যার্ৎস জানিয়েছিলেন, তার নেতৃত্বে এএফডির বিরুদ্ধে একটা ‘অগ্নিবলয়’ গড়ে তোলা হবে।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে এএফডির বিরুদ্ধে ‘অগ্নিবলয়’ দুর্বল উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এএফডির সঙ্গে বিভিন্ন দলের সখ্যতা দেখা যাচ্ছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে এএফডি একটি ‘স্বাভাবিক’ দল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যেতে পারে।
এই প্রবণতা স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
গত ২৪ আগস্ট, অর্থাৎ স্যাক্সনি-আনহাল্টে নির্বাচনের ১২ দিন আগে ফরেন পলিসি সাময়িকীর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছিল—‘জার্মানির অগ্নিবলয় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে’।
প্রতিবেদন অনুসারে, এএফডিকে এক ঘরে করার নীতি একদিকে যেমন এই দলটির জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে; অন্যদিক, জার্মানির উগ্র ডানপন্থি দলটিকে আরও উগ্রবাদী করে তুলেছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানায়—এএফডি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ৩ আসন দূরে। দলটির নেতা উলরিশ সিগমুন্ড চেষ্টা করছেন অন্যান্য দলের সমর্থন নিতে।
বেশিরভাগ নির্বাচিত দল বলছে, তারা উগ্রবাদী এএফডিকে সরকার গড়তে সমর্থন দেবে না। তবে কোনো একটি দলের সমর্থন নিয়ে এএফডি সরকার গড়লে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটি চরম উগ্রবাদী দল জার্মানিতে ক্ষমতার স্বাদ পাবে।
প্রতিবেদনটিতে এএফডির বিজয়কে ‘ধ্বংসাত্মক’, ‘৯ মাত্রার ভূমিকম্প’, ‘চরম সতর্কতা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির শাসনব্যবস্থার প্রতি হুমকি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই ‘অগ্নিবলয়’ তৈরির প্রচেষ্টা এএফডিকে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে কি না তাই এখন দেখার বিষয়।
বিশ্ববাসী ইতোমধ্যে জেনে গেছেন, ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ হিসেবে সুপরিচিত উত্তর ইউরোপের দেশ সুইডেনের জাতীয় নির্বাচনে মধ্য বামপন্থি বিরোধী জোট ক্ষমতাসীন ডানপন্থি সরকারের তুলনায় বেশি আসন পেয়েছে।
গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, বামপন্থি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস ৩৪৯ আসনের পার্লামেন্টে ১৭৬ আসন ও ক্ষমতাসীন জোট ১৭৩ আসন পেতে যাচ্ছে। পুরো ফলাফল পেতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।
সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের এমন ফলাফল নর্ডিক দেশটির ঐতিহ্যবাহী উদার দৃষ্টিভঙ্গি থামিয়ে দিতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—ক্ষমতাসীন জোট আবার বিজয়ী হলে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব আরও চাঙ্গা হতে পারে। অন্যদিকে, বামপন্থিরা বিজয়ী হলে সুইডেনের পশ্চিমা মূল্যবোধের রাজনীতিতে আঘাত আসতে পারে।
অর্থাৎ, ইউরোপ একটি যুগসন্ধিক্ষণে পড়েছে।
এ কথা সবাই জানেন যে—পশ্চিম ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্য থেকে শুরু করে ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া হয়ে পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড পর্যন্ত কট্টরপন্থিদের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন সাময়িকী ‘পলিটিকো’র ইউরোপীয় সংস্করণের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘ডানপন্থিদের ক্ষমতায় যাওয়ার নতুন পথ: মধ্যপন্থি হওয়া যাবে না। কট্টরপন্থি হতে হবে।’
এতে বলা হয়, পূর্ব জার্মানির এক রাজ্যে এএফডির বিজয় অনেক সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে।
আরও বলা হয়—বেশ কয়েক বছর ধরে ইউরোপে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তা হলো: ইউরোপের ডানপন্থি দলগুলোকে হয় মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হয়, নয়ত ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়। এখন অন্য একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তা হলো: চরমপন্থা অবলম্বন করো এবং বিজয়ী হও।
প্রতিবেদনে জানানো হয়—জার্মানিতে এএফডির বিজয় আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাশেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর তাই মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ‘ওয়াও!’ লিখে আত্মতুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি জার্মানিকে আবারও ‘মহান’ রাষ্ট্র হিসেবে দেখার প্রত্যয় জানিয়েছেন।
তিনি আরও লিখেছেন, অভিবাসীদের নিয়ে জার্মানি এখন ক্লান্ত। অভিবাসন জার্মানির অনেক ক্ষতি করেছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর দ্য গার্ডিয়ান এক সংবাদ বিশ্লেষণের শিরোনামে লিখেছে—এএফডির বিজয়ে ইউরোপের মধ্যপন্থিরা জাতীয়তাবাদীদের ভয় পাচ্ছে। এর জন্য মধ্যপন্থিরা নিজেরাই দায়ী।
এতে বলা হয়—আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাথিজ রুডুজিনের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমানে ইউরোপের প্রতি ৪ ভোটারের একজন উগ্র ডানপন্থিদের ভোট দিচ্ছেন। ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে হিসাব করলে দেখা যায় যে গত ৩ দশকে উগ্র ডানপন্থিদের ভোট প্রায় ৫ গুণ বেড়েছে।
গত ৩ বছরে উগ্র ডানপন্থিদের ভোট ব্যাপকহারে বেড়েছে, বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
‘পলিটিকো’-এর সেই প্রতিবেদনটিতে আরও জানানো হয়—পর্তুগালের চরম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ‘রিকনকিস্তা’র নেতা আফোনসো গনজালভেস মনে করেন, স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির বিজয় প্রমাণ করছে জাতীয়তাবাদ ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতি নির্বাচনে জেতা ও রাষ্ট্রকে রক্ষার মূল হাতিয়ার।
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এএফডি জার্মানিতে অভিবাসনবিরোধী অবস্থান নিয়ে ক্রমশ দেশটির ভোটারদের গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, দলটির এমন অবস্থানের ফলে দেশটিতে মুসলিম অভিবাসীদের ওপর বিদ্বেষমূলক চাপ সৃষ্টি হবে।
কারও মতে—জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে অর্থাৎ, একদা পূর্ব জার্মানির এক রাজ্যে এই দলটি জনপ্রিয়তা পেলেও জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলে বা একদা পশ্চিম জার্মানিতে এর প্রভাব কম। তাই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পূর্ব জার্মানির এক রাজ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের বিজয়ে এখনই অনেকে আতঙ্কিত হতে নারাজ।
এএফডিকে ‘নব্য নাৎসি’ দল মনে করা হলেও এই দলটি প্রকাশ্যে ইহুদি-বিদ্বেষ প্রকাশ করছে কিনা তা নিয়েও অনেকে আলোচনা করছেন।
গত ৬ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুসালেম পোস্ট এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে—‘স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে এএফডির বিজয় জার্মানিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, ইহুদিদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত কি?’
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এএফডি আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদি ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল। কিন্তু, দলটি যখন ধর্মীয় কারণে পশু জবাইয়ের ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার দাবি জানায় তখন তা ইহুদিদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
এ ছাড়াও, এএফডির নেতাকর্মীরা এমনসব স্লোগান দেন যেগুলো নাৎসি আমলে দেওয়া হতো।
গত ৭ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে, ‘ইসরায়েল সরাসরি নিন্দা না করলেও এএফডির ঐতিহাসিক বিজয়ে জার্মানির ইহুদিরা আতঙ্কিত’।
অনেক বিশ্লেষকের ভাষ্য: স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে এএফডি বিজয়ী হওয়ায় দলটি এখন সরকারিভাবে নিজেদের মতাদর্শ প্রচার ও বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে। যা মোটের ওপর সবার জন্যই আশঙ্কার।
আর এ কারণেই ইউরোপ যেন যারপরনাই উদ্বিগ্ন।
