মিরপুরের স্টেডিয়াম কিংবা হোম অব ক্রিকেটের সবুজ গালিচায় একটা দৃশ্য বড্ড পরিচিত—ম্যাচ শেষ, সংবাদ সম্মেলনে এসে অধিনায়কের সেই চেনা দীর্ঘশ্বাস, আর স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করা একটা মামুলি রান।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে ঘুরেফিরে ঠিক এই একটা গল্পই বারবার মঞ্চস্থ হচ্ছে। কেবল প্রতিপক্ষ বদলায়, টুর্নামেন্টের নাম বদলায়, কিন্তু টাইগ্রেসদের ব্যাটিং লাইনের সেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার চিত্রনাট্য একই থেকে যায়। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে ভক্তদের মনে যে আশার সলতেটুকু জ্বলে ওঠে, পাওয়ারপ্লে পার হতে না হতেই তা নিভে যায় ডট বলের অনাবিল বন্যায়।
এই চরম অচলাবস্থার নেপথ্যে কোনো অলৌকিক কারণ নেই, লুকিয়ে আছে কিছু কঠোর বাস্তবতা।
সবচেয়ে বড় গলদ আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পেস, বাউন্স আর সুইংয়ের তোড় সামলানোর যে প্রস্তুতি দরকার, তার ছিটেফোঁটাও নেই আমাদের ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোতে। ফলে দেশের মাটিতে রান পেলেও বিশ্বমঞ্চে বিদেশি বোলারদের গতি আর স্পিনের মুখে পড়ে ব্যাটাররা হারিয়ে ফেলেন দিশা।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডট বলের মহোৎসব। আধুনিক টি-টোয়েন্টি কিংবা ওডিআই যেখানে চার-ছক্কার ফুলঝুড়িতে এগায়, সেখানে আমাদের ব্যাটাররা ভুগে থাকেন স্ট্রাইক রোটেট করার প্রাথমিক দক্ষতাহীনতায়। বাউন্ডারি তো দূরের কথা, সিঙ্গেলস নিয়ে যে চাপ আলগা করবেন, সেই পথটাও জানা থাকে না অনেক সময়। তার ওপর পুরো দলের ব্যাটিং যেন একলা কাঁধে টেনে চলছেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। টপ অর্ডার শুরুতেই খসে পড়লে জ্যোতি একা কতদূর টানবেন? তিনি আউট হওয়া মানেই তাসের ঘরের মতো বাকিদের ভেঙে পড়া।
বিসিবি অবশ্য বারেবারে সমাধানের পথ খোঁজে কোচ বদলের প্রেসক্রিপশনে। একটা বড় টুর্নামেন্ট শেষ হয়, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের টনক নড়ে, শুরু হয় বিদেশি কোচ আনার কিংবা ছাঁটাইয়ের খেলা। কিন্তু গোড়ায় পানি না ঢেলে ডালপালা ছেঁটে কি আর গাছের চেহারা বদলানো যায়?
তাহলে কি এই ব্যাটিং-দৈন্যের কোনো শেষ নেই?
পাহাড়সম এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ একটাই—তাসের ঘর ভেঙে নতুন করে ভিত গড়া। বিদেশি কোচ আনা বাদ দিয়ে আগে ঘরোয়া ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক পেস ও স্পিন আক্রমণের মহড়া দেওয়ার জন্য যুক্ত করতে হবে স্পেশালিস্ট পাওয়ার হিটিং কোচ। পাশাপাশি বয়সভিত্তিক এবং ‘এ’ দলকে নিয়মিত বিদেশে পাঠিয়ে কঠিন কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হবে।
কোচ বদলের সাময়িক টোটকায় রোগ সারবে না; দরকার একটা দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান। তা না হলে এই ব্যাটিং-দৈন্যের গল্পটা লেখা হতেই থাকবে, আর লাল-সবুজের সমর্থকরা কেবল শেষ না হওয়া এক দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী হয়েই রবে।
