টিয়ার গ্যাস-লাঠিচার্জ, আটকের দাবি: দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভে দিনভর যা ঘটল

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ।

আজ সোমবার পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন আয়োজিত এই কর্মসূচিতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ অংশ নেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু। বিক্ষোভের সময় ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে পুলিশ আটক করেছে বলে দাবি করেছে দলটি।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ চালায় পুলিশ। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আশ্রয়ের চেষ্টা করেন। বিক্ষোভকারীরা মূলত নিট (NEET) পরীক্ষাসহ বিভিন্ন জাতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও অনিয়মের অভিযোগে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছেন।

সংসদ ভবনের দিকে বিক্ষোভকারীরা এগিয়ে গেলে দীপকেকে আটক করা হয় বলে জানায় দ্য স্টেটসম্যান। দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে পুলিশ। তিনি সংসদ সদস্যদের রাস্তায় নামা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

সংসদ ভবন থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে রাইসিনা রোডে বিক্ষোভকারীদের থামিয়ে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয় এবং সংসদ মার্গ থানার সামনেও লাঠিচার্জ করা হয়। এতে কয়েকজন আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানায় হিন্দু।

সকাল থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে যন্তর মন্তরে হাজারো শিক্ষার্থী ও সমর্থক জড়ো হতে থাকেন বলে জানায় এএফপি। গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে এটিই অন্যতম বড় বিক্ষোভ বলে উল্লেখ করেছে সংবাদ সংস্থাটি।

১৮ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী সুমিত কুমার এএফপিকে বলেন, ‘এই দেশের তরুণদের কথা শুনবে এবং নিজেদের ভুল সংশোধন করবে—আমরা এমন একটি সরকার চাই। ভবিষ্যৎ আমাদের, রাজনীতিবিদদের নয়।’

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অংশ নেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। পরে প্রেস ক্লাবের সামনে আবার জড়ো হয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। সিজেপির কর্মীদের পাশাপাশি সেখানে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন বলে জানায় স্টেটসম্যান।

হিন্দু ও স্টেটসম্যানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাংকা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট বৈঠক করেন। সেখানে তারা আন্দোলনের দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি তুলে দেন।

সৌরভ দাসের দাবি, নাড্ডা বিষয়টি সরকারের ভেতরে উত্থাপনের আশ্বাস দিয়েছেন। স্মারকলিপিতে আন্দোলনের দাবির পাশাপাশি পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুককে অবিলম্বে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে বলে জানায় হিন্দু।

গত ২০ জুন থেকে শিক্ষা ও চাকরির নিয়োগ ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি নিয়ে যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে সিজেপি।

স্টেটসম্যান জানায়, সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেন। পরে তাকে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোর অভিযোগ, ওয়াংচুককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হাসপাতালে রাখা হয়েছে।

দিল্লি হাইকোর্ট রোববার অন্তর্বর্তীকালীন মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি তাকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের আবেদন করে আবারও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

এএফপি জানায়, গত শনিবার ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার ২০ দিনের অনশন শেষ হয়। এই ঘটনাই সোমবারের বিক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে।

ওয়াংচুক ঘোষণা দিয়েছেন, সরকার যদি শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে অথবা পার্লামেন্ট সদস্যরা বিষয়টি পার্লামেন্টে উত্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে তিনি অনশন প্রত্যাহার করবেন।

এএফপি জানিয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে বাতিল হওয়া নিট পরীক্ষায় গত মাসে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ২০ লাখ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীর পরীক্ষার অনলাইন মূল্যায়ন নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারতের কোটি কোটি তরুণ এখনো স্থায়ী ও ভালো বেতনের চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও বেকারত্বের ইস্যুতে ক্ষোভ বাড়ছে।

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার কারণে দিল্লি মেট্রোর পাঁচটি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় বলে জানায় হিন্দু। পরে সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট ও রাজীব চৌক স্টেশনের প্রবেশপথ এবং ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা আবার চালু করা হয়।

মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। দিল্লি পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, এই কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিক্ষোভের মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্ট ভবনে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে জানায় স্টেটসম্যান। তবে বৈঠকের বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ‘হাজারো শিক্ষার্থী যন্তর মন্তরে জড়ো হয়েছেন। সরকার বলপ্রয়োগ করে তাদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করছে।’

লোকসভাতেও বিরোধী সদস্যরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে স্লোগান দেন। তবে পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই বিক্ষোভের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

এএফপি প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মে মাসে যাত্রা শুরু করা সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অল্প সময়েই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও বেকারত্বের মতো ইস্যুতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনকে ২০২৪ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Related Articles

Latest Posts