আমরা দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বাঁচতে চাই। তাই ভালো খাবার খাই, ব্যায়াম করি, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করি। অনেকে মনে করেন, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের রহস্য শুধু এগুলোতেই লুকিয়ে আছে। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা বলছে, মানুষের ব্যক্তিত্বও দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইতালির একদল গবেষক এমনই একটি তথ্য জানিয়েছেন। তাদের গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ অ্যাপ্লাইড পজিটিভ সাইকোলজি জার্নালে।
পৃথিবীতে এমন কয়েকটি অঞ্চল আছে, যেখানে অনেক মানুষ ১০০ বছর বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকেন। এসব এলাকাকে বিজ্ঞানীরা ‘ব্লু জোন’ বলে থাকেন।
ইতালির সার্ডিনিয়া এমনই একটি ব্লু জোন। এখানকার মানুষ শুধু দীর্ঘদিনই বাঁচেন না, অনেকেই বার্ধক্যেও বেশ সক্রিয় থাকেন।
এই রহস্য জানতেই ইতালির কাগলিয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী মারিয়া কিয়ারা ফাস্তামে ও তার সহকর্মীরা গবেষণা চালান।
গবেষকদের প্রশ্ন ছিল, দীর্ঘদিন সুস্থ থাকার পেছনে কি মানুষের ব্যক্তিত্বেরও কোনো ভূমিকা আছে?
তাদের ধারণা ছিল, যাদের ব্যক্তিত্ব ইতিবাচক, তারা হয়তো মানসিকভাবে ভালো থাকেন, নানা শখের কাজ করেন এবং জীবনকে আরও উপভোগ করেন। আর এসব বিষয় বার্ধক্যে সুস্থ থাকতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় অংশ নেন ৭১ থেকে ১০১ বছর বয়সী ১২৫ জন মানুষ। এর মধ্যে ৫৫ জন ছিলেন সার্ডিনিয়ার ব্লু জোনের বাসিন্দা এবং ৭০ জন ছিলেন কাছাকাছি অন্য এলাকার মানুষ।
দুই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, আর্থসামাজিক অবস্থা এবং ইতালির সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ প্রায় একই ছিল। তাই তুলনা করা সহজ হয়েছে।
প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে কথা বলা হয়, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর নেওয়া হয় এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।
এ ছাড়া তাদের ব্যক্তিত্বও যাচাই করা হয়। বিজ্ঞানীরা ‘বিগ ফাইভ’ নামে পরিচিত পাঁচটি বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করেন। এগুলো হলো—নতুন বিষয় জানার আগ্রহ, দায়িত্বশীলতা, মিশুক স্বভাব, সহযোগিতাপ্রবণতা, সহজে দুশ্চিন্তা বা মানসিক অস্থিরতায় ভোগা।
গবেষণায় দেখা যায়, ব্লু জোনের মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য অন্যদের তুলনায় খুব বেশি আলাদা ছিল না।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্টভাবে আলাদা ছিল।
তাদের মধ্যে নতুন কিছু জানার আগ্রহ বা উন্মুক্ত মানসিকতা অনেক বেশি ছিল। অর্থাৎ তারা নতুন কিছু শিখতে ভালোবাসতেন, নতুন অভিজ্ঞতা নিতে আগ্রহী ছিলেন এবং নতুন ধারণা সহজে গ্রহণ করতেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ব্লু জোনের মানুষের—মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা বেশি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা ভালো, অবসরে তারা বই পড়া, নানা শখের কাজ, হাঁটাহাঁটি বা শরীর ও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এমন কাজে বেশি সময় দেন।
গবেষকেরা যখন সব অংশগ্রহণকারীর তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেন, তখন আরও কিছু বিষয় জানা যায়।
যাদের নতুন বিষয় শেখার আগ্রহ বেশি, তারা সাধারণত মানসিকভাবে বেশি সুখী এবং শখের কাজে বেশি সময় দেন।
যারা বেশি দায়িত্বশীল, তারা জীবনে বেশি সন্তুষ্ট থাকেন এবং কঠিন পরিস্থিতি সহজে সামলাতে পারেন।
অন্যদিকে, যারা বেশি দুশ্চিন্তা করেন বা মানসিকভাবে অস্থির থাকেন, তাদের জীবনমান তুলনামূলক কম।
না, এমনটা এখনো বলা যাচ্ছে না।
গবেষকেরা পরিষ্কার করে বলেছেন, ব্যক্তিত্ব সরাসরি মানুষের আয়ু বাড়ায়, এমন প্রমাণ তারা পাননি। তবে ব্যক্তিত্ব জীবনযাপনের ধরন বদলে দিতে পারে।
যেমন, যে মানুষ নতুন কিছু শিখতে ভালোবাসে, সে নতুন মানুষের সঙ্গে মেশে, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে, শখের কাজ করে, শরীরচর্চা করে এবং সারাজীবন শেখার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এসব অভ্যাসই তাকে সুস্থ ও সক্রিয় থাকতে সাহায্য করতে পারে।
এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। আবার এটি ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। তাই শুধু এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ব্যক্তিত্বই দীর্ঘ জীবনের কারণ।
তবে এর আগের দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, জীবনের উদ্দেশ্যবোধ, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং কিছু ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।
মোট কথা দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের জন্য ভালো খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা জরুরি, তা আগেই জানা ছিল।
নতুন এই গবেষণা বলছে, এর সঙ্গে কৌতূহলী হওয়া, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, দায়িত্বশীলতা এবং মানসিক দৃঢ়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
