টানা ২৮৬ দিন সমুদ্রে থাকার পর আজ বুধবার থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে ভিড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনা নিয়ে আসা রণতরিটি ২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে অবস্থান করবে।
দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য নাবিকদের বিশ্রাম, পুনরুদ্ধার ও প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ। থাই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সফরের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কোনো সম্পর্ক নেই।
রয়টার্স জানিয়েছে, গত বছরের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে যাত্রা করা লিংকনকে প্রথমে দক্ষিণ চীন সাগরে দায়িত্ব পালনের জন্য মোতায়েন করা হয়েছিল। পরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। সেখানে এটি সামরিক অভিযান এবং ইরানকে ঘিরে নৌ অবরোধে অংশ নেয়।
এত দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার পর এটিই রণতরিটির পূর্ণাঙ্গ বন্দর সফর। লিংকনের সঙ্গে আরও মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থাইল্যান্ডে এসেছে। এর মধ্যে ইউএসএস ফ্র্যাঙ্ক ই পিটারসেন জুনিয়র লায়েম চাবাংয়ের কাছের শ্রী রাচিতে এবং ইউএসএস রবার্ট স্মলস ম্যাপ তা ফুত এলাকায় অবস্থান করছে।
পাতায়ায় ঘোরাঘুরি ও বিশ্রাম
মার্কিন নাবিক ও মেরিন সেনাদের একটি বড় অংশ থাইল্যান্ডের পর্যটননগরী পাতায়ায় সময় কাটাবেন। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার পর স্থলে নেমে বিশ্রাম নেওয়াই এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। স্থানীয় প্রশাসন তাদের জন্য লায়েম চাবাং ও পাতায়ার মধ্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছে।
এএফপি বলছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থেকেই মার্কিন সেনাদের বিশ্রাম ও বিনোদনের অন্যতম গন্তব্য পাতায়া। বর্তমানে শহরটি সমুদ্রসৈকত ও ব্যস্ত রাতের জীবনযাপনের পাশাপাশি যৌন পর্যটনের জন্যও পরিচিত।
শপিং ও পর্যটন
নাবিকরা শপিং মল, রেস্তোরাঁ এবং পাতায়ার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যেতে পারবেন। স্থানীয় মেয়র তাদের শহরের বিভিন্ন বৈধ পর্যটন আকর্ষণ উপভোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয় দোকান ও রেস্তোরাঁয় যাওয়া
স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন নাবিকদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। পোশাকের দোকান থেকে রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন ব্যবসায়ী বাড়তি ক্রেতার প্রত্যাশা করছেন। স্থানীয় এক দর্জির দোকান মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের জন্য দ্রুত পোশাক সরবরাহের বিজ্ঞাপনও দিয়েছে।
বিনোদন ও নাইটলাইফ
পাতায়ার বিনোদনকেন্দ্রগুলোতেও নাবিকদের যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য কিছু সময়সীমা ও আচরণবিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
জেট স্কিসহ জলক্রীড়া
পাতায়ার মেয়র পরামাসে এনগামপিচেস জানিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের জেট স্কিসহ বিভিন্ন ধরনের জলক্রীড়ায় অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ। বাঞ্জি জাম্পিং, কুস্তি ও বক্সিংয়ের মতো কিছু কর্মকাণ্ড থেকেও তাদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
ক্যানাবিস ব্যবহার
থাইল্যান্ডে ক্যানাবিস-সংক্রান্ত তুলনামূলক শিথিল আইন থাকলেও মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যরা এর সুবিধা নিতে পারবেন না। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের ক্যানাবিস-সংক্রান্ত দোকান ও কার্যক্রম থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
নির্দিষ্ট নাইটলাইফ এলাকা
পাতায়া কর্তৃপক্ষ ইউএস নেভি সদস্যদের জন্য সোই ৬, সোই ৬/১ এবং সোই ৭-কে ‘অফ-লিমিটস’ বা নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ৩১ আগস্টের নিরাপত্তা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মার্কিন নাবিকদের জাহাজ থেকে পাতায়ায় আনা-নেওয়ার জন্য প্রায় ৪০টি বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন দলে পাতায়ায় যাবেন এবং রণতরিটি থাইল্যান্ড ছাড়ার আগ পর্যন্ত এই পরিবহনব্যবস্থা চালু থাকবে।
থাই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের প্রস্তুতির অন্যতম লক্ষ্য হলো নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা যেন বিদেশি সেনাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম না নেন, তা দেখা।
মার্কিন সামরিক সদস্যের আগমনকে কেন্দ্র করে পাতায়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রাদেশিক গভর্নর নারিত নিরামাইওয়ং জানিয়েছেন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য প্রায় ৬০০ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।
শহরের প্রধান সমুদ্রসৈকত ও রাতের বিনোদন এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ টহল দিচ্ছে। মার্কিন নাবিকদের বিপুল উপস্থিতির কারণে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য থাই কর্তৃপক্ষ ও মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা দলগুলো সমন্বয় করে কাজ করছে।
মার্কিন নাবিকদের আগমনের আগে পাতায়ায় যৌনকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযানও হয়েছে। সপ্তাহান্তের অভিযানে ৪০ থেকে ৫০ জনকে যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে আটক করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে পাতায়ার মেয়র বলেছেন, এই অভিযান নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং মার্কিন নাবিকদের আগমনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
থাইল্যান্ডে যৌন ব্যবসা বেআইনি হলেও পাতায়া, ব্যাংকক ও ফুকেটের মতো পর্যটনকেন্দ্রে এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই চলে আসছে। এ কারণে মার্কিন নাবিকদের আগমনকে কেন্দ্র করে শহরের এই দিকটি নিয়েও বাড়তি নজরদারি চালানো হচ্ছে।
মার্কিন নাবিকদের পাঁচ দিনের অবস্থানকে ঘিরে পাতায়ার ব্যবসায়ীরা আশাবাদী। শহরটি বর্তমানে পর্যটনের তুলনামূলক কম মৌসুমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রায় পাঁচ হাজার সামরিক সদস্যের উপস্থিতি হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পোশাক ও অন্যান্য সেবা খাতের ব্যবসায় বাড়তি আয় আনতে পারে।
পাতায়ার মেয়র আশা করছেন, মার্কিন সামরিক সদস্যদের এই সফর থেকে শহরে প্রায় ১০ কোটি থাই বাত (প্রায় ৩০ লাখ ডলার) আয় হতে পারে।
স্থানীয় দোকানিরাও এরই মধ্যে প্রস্তুতি নিয়েছেন। একজন পোশাক বিক্রেতা জানিয়েছেন, মার্কিন নাবিকদের জন্য তিনি বাড়তি পণ্য মজুত করেছেন। অন্য ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মার্কিন সামরিক জাহাজের সফর সাধারণত স্থানীয় ব্যবসার জন্য ভালো সুযোগ তৈরি করে।
আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন শুধু সামরিক কারণে নয়, জাহাজের ভেতরের জীবনযাত্রা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক তৈরি করেছে।
জাহাজে খাবারের ঘাটতি, প্লাম্বিং ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা জাহাজটির পরিস্থিতি তদন্তের দাবি করেছেন।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এসব উদ্বেগের গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছে। ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সচিব হাং কাও আগস্টে বলেন, অল্পসংখ্যক মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঘটনা চিকিৎসার আওতায় এসেছে এবং কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
এই প্রেক্ষাপটে থাইল্যান্ডের পাঁচ দিনের বন্দর সফর নাবিকদের জন্য দীর্ঘ সময় পর স্থলে নেমে বিশ্রাম নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ-৩-এর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল রবার্ট ই লোগরানও বলেছেন, লায়েম চাবাংয়ের এই সফর নাবিক ও মেরিন সেনাদের ‘বিশ্রাম ও নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের’ সুযোগ দেবে।
পাঁচ দিনের বন্দর সফর শেষে আগামী রোববার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের থাইল্যান্ড ছাড়ার কথা রয়েছে। এরপর রণতরিটি যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে যাবে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে লিংকনের জায়গায় ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন দায়িত্ব নিয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সেটিকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট দিয়ে প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। থাইল্যান্ড ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্র হয় এবং ২০০৩ সালে প্রধান ন্যাটোবহির্ভূত মিত্রের মর্যাদা পায়। দুই দেশের সামরিক বাহিনী নিয়মিত যৌথ মহড়াও পরিচালনা করে। থাই কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের সফরও সেই দীর্ঘ সামরিক সম্পর্কের অংশ এবং এর উদ্দেশ্য মূলত বিশ্রাম, পুনরুদ্ধার ও রসদসংক্রান্ত কার্যক্রম।
