সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বলয় গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত ৭ আগস্ট তিন মুসলিমপ্রধান দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভারতের গণমাধ্যমগুলোতেও এই জোটের খুঁটিনাটি বিষয়, ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য এবং ভারতের নিরাপত্তায় এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ ও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
সোমবার তুরস্কের প্রধান বাণিজ্যিক শহর ইস্তাম্বুলে এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরমাণু ক্ষমতাসম্পন্ন পাকিস্তান, খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ সৌদি আরব ও সামরিক শক্তিধর তুরস্ক তাদের এই নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক নাম দিয়েছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোট’।
ভারতের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলোতে ইস্তান্বুলের বৈঠক আর মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একাধিক খবরে ঘুরেফিরে এসেছে একটি প্রশ্ন—এই তিন দেশের জোটকে কি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা যায়?
হিন্দুস্তান টাইমসের মতামত কলামে শিরোনাম করা হয়েছে, ‘মক্কা জোট নিয়ে যেসব প্রশ্ন ভারতের নিজেকে করা উচিত।’ কলামের লেখক প্রখ্যাত সাংবাদিক করণ থাপারের দাবি, মক্কা চুক্তি ভারতের প্রতিবেশী পাকিস্তানের হাতকে শক্তিশালী করেছে। এই জোটের মাধ্যমে দেশটি পশ্চিম এশিয়ায় তাদের প্রভাব আরও সম্প্রসারিত ও গভীর করেছে।
এই কলামে ভারতের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে নানা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন লেখক। তিনি দাবি করেছেন, মক্কা জোটের সদস্যরা সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তুরস্কের দক্ষতা, সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রভান্ডারের শক্তিকে সমন্বিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
করণ থাপার মনে করেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পাকিস্তানের উদ্বেগের প্রধান কারণ ভারত। মূলত নয়াদিল্লির দিক থেকে বাড়তি সুরক্ষা পেতেই রিয়াদ-আঙ্কারার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ইসলামাবাদ। এই দুই পরাক্রমশালী দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে পাকিস্তান আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে কি না, ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার অনুরোধ জানান তিনি।
লেখকের মতে, এই চুক্তির সঙ্গে কাশ্মীর ও জঙ্গি হামলার মতো বিষয়গুলোও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছিলেন যে ‘অপারেশন সিঁদুর’ এখনো শেষ হয়নি, শুধু স্থগিত রাখা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের জঙ্গি হামলা আসলে তার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে, এ কথাও বলেছেন ভারতের নেতা।
তবে এই কলামিস্টের শঙ্কা, মক্কা জোটের আবির্ভাবে সেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে এবং পাকিস্তানে আঘাত হানার আগে ভারতকে এখন দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে। কারণ, এই চুক্তির অন্যতম শর্ত হলো—যেকোনো এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো তাকে সুরক্ষা দেবে, যা অনেকটা ন্যাটো জোটের ‘আর্টিকেল ফাইভ’ এর মতো। এ কারণে কাশ্মীরের বিতর্কিত সীমান্তে ভারতবিরোধী সংগঠনগুলোর তৎপরতা বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন লেখক।
আরেক ভারতীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে মক্কা জোটকে সরাসরি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ এবং পাকিস্তানকে এর ‘নেতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মক্কা জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার বিষয়টিকে ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ফাইভ’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
অর্থাৎ জোটের কোনো সদস্যের ওপর হামলা হলে বাকি সদস্যরা তাকে সামরিক সুরক্ষা দিতে বাধ্য থাকবে।
তবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে এই শর্ত বা মক্কা জোটের গঠনের সঙ্গে ইরান বা অন্য কোনো দেশের যুদ্ধের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। উল্লেখ্য, ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের পরই দ্বিতীয় অবস্থানে আছে তুরস্ক। দেশটি জানিয়েছে, মক্কা জোটের সদস্যপদ উন্মুক্ত আছে এবং চাইলে অন্যান্য দেশও এতে যোগ দিতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত ‘পাকিস্তানের নেতৃত্বের’ বিষয়টি অবশ্য পরে রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে। সরাসরি নেতৃত্ব নয়, বরং আগামী তিন বছরের জন্য জোটের মহাসচিবের দায়িত্ব পাবেন একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা।
ইকোনমিক টাইমসের ৩০ আগস্টের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বলা হয়, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়েছে ঢাকা এবং এতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিতে কোনো ঝুঁকি দেখছে না তারা।
গত রোববার, ৩০ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে কোনো ঝুঁকি দেখছে না বাংলাদেশ। বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় দেশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার আলোকে উদ্যোগটিকে একটি ‘অনন্য’ ও নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছে ঢাকা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবসময় বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দেশের প্রমাণিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে।
প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বরাতে উল্লেখ করা হয়, ভারতের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন সব ঘটনার ওপর নয়াদিল্লি নিবিড়ভাবে নজর রাখছে এবং তা সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিচ্ছে।
প্রতিবেদনে কয়েকজন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিবিদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তাদের বক্তব্যের সারমর্ম হলো, এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত। তাদের মতে, এমন পদক্ষেপ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে।
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেন, ‘চুক্তির বর্তমান তিন অংশীদার দেশই সামরিক সংঘাতে জড়িত অথবা অন্য দেশের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’
‘মক্কা চুক্তির মতো একটি সামরিক চুক্তি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য কোনোভাবেই অপরিহার্য নয়’, যোগ করেন তিনি।
সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, এই চুক্তিতে সম্মিলিত সুরক্ষা নিয়ে একটি ধারা আছে। অর্থাৎ এক সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে বাকিদের ওই সদস্যের সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।
‘যার ফলে, বাংলাদেশ অহেতুক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়তে পারে’, মত দেন তিনি।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির ইকোনমিক টাইমসকে বলেন, প্রথাগতভাবে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘এটা যদি সামরিক জোট হয়, তাহলে এর সব সদস্যের নিরাপত্তাস্বার্থ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তাস্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে।’
‘(পরবর্তীতে) নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হলে তা বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সামগ্রিক কৌশলগত স্বার্থে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
তবে অনেকে বলছেন, এই জোটে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব থাকবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ফজলে এলাহী আকবর বর্তমানে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) প্রধান হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি মত দেন, ‘(মক্কা) জোটে যোগ দিলেই “আমরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ব”—এমন যুক্তি দেওয়ার অর্থ হলো এ ধরনের ঝুঁকিকে অতিরঞ্জিত করে দেখা।’
