নব্বইয়ের দশকে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে একটি দৃশ্য প্রায়ই দেখা যেত। এক লোক, খুব চেঁচিয়ে বলছেন ‘ইয়ে মুসালমানকা খুন, ইয়ে হিন্দুকা খুন। বাতা ইসমে মুসালমানকা কোনসা ওর হিন্দুকা কোনসা’; ২০২৬ সালে এই সংলাপ ভারতের কোনো সিনেমাতে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ১৯৯৪ সালের ক্রান্তিবীর সিনেমায় ঠিকই সম্ভব হয়েছিল। সংলাপটি দিয়েছিলেন নানা পাটেকর! আর সিনেমার জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার।
নানা পাটেকর কেবল তার চোখ, ডায়লগ বলা, ক্ষুব্ধ, বিরক্তি, আক্রোশ দিয়েই স্ক্রিনের সামনে ধরে রেখেছেন কোটি মানুষকে। এই একই নানা সিনেমাতে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সংলাপ দেন ‘কন্ট্রোল উদয় কন্ট্রোল’ তখন সেটি হয় কমেডি, আমরা হাসি, শেয়ার হয় অসংখ্য মিম। তবে কতটাই বা নিয়ন্ত্রণ (‘কন্ট্রোল’) করতে পেরেছিলেন নিজেকে তিনি? কারগিল যুদ্ধ শুরু হলে ছুটে যান কাশ্মিরের বরফের পাহাড়ে, অংশ নেন যুদ্ধে, সামলে নেন পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ। সেই ‘ক্ষুব্ধ’ নানা, মহারাষ্ট্রের খরা হওয়ায় আবার এগিয়ে যান কৃষকদের সহায়তার জন্য; তাদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

নিজের মন-মর্জিতে কাজ ও মেজাজের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা মঞ্চনাটকে পেতেন ‘আসল’ অভিনয়ের তৃপ্তি।সমসাময়িক আরও অভিনেতা যেমন নাসির উদ্দিন শাহ ও ওম পুরির মতো বারবার ফিরে যেতেন মঞ্চে। আজ যখন নানা পাটেকর গোয়াতে ভারতের স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২০ মিনিটে মারা যান তখন পেছনে রেখে যান ৭৫টি বছর, পাঁচ দশক বিস্তৃত কাজ, তিনটি জাতীয় পুরস্কার, অসংখ্য স্মৃতি এবং সর্বোপরি একটি বিরল ব্যক্তিত্ব।
’৭৮ সালে গমন সিনেমা দিয়ে নানা পাটেকর তার অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেন, এই কথাটি বেশ গতানুগতিক। আদতে শুরু হয় মারাঠি অভিনয় দলের তামাশা দেখার মাধ্যমে। বাবার সঙ্গে তিনি তামাশা দেখতে যেতেন। তামাশা হলো গান, নাচ ও ‘অতিরঞ্জিত’ অভিনয়ের মাধ্যমে এক ধরনের নাট্য পরিবেশন যা মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। নানা পাটেকর সেসব তামাশা দেখতে যেতেন, অভিনয় উপভোগ এবং নিজেও অভিনয়ের চেষ্টা করতেন।
নানা যখন অভিনয় শুরু করেন তখন ভারতীয় সিনেমা জগত বিশেষ করে হিন্দি সিনেমা দুই ভাগে বিভক্ত। এক দিক ৭০ এর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ৮০ এর দশকে হিন্দি সিনেমায় আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সম্পৃক্ততা; অনিল কাপুর, ঋষি কাপুর ও মিঠুন চক্রবর্তীদের মতো রোমান্টিক ও অ্যাকশন অভিনেতাদের বাজার দখল, আরেক দিকে শ্যাম বেনেগালের মতো পরিচালকদের সমান্তরাল সিনেমা। নানা পাটেকর দেশের পরিস্থিতি আর নিজের জীবনের বাস্তবতার বাইরে গেলেন না। বেছে নিলেন গমন (১৯৭৮) সিনেমার বসু চরিত্র।

নানা তার সিনেমা ক্যারিয়ারে এমন সব চরিত্রের সঙ্গেই নিজেকে মিশিয়ে ফেললেন যেগুলো সিনেমার ভাষায় ‘খল’ বা মন্দ চরিত্র। তবে সব চরিত্রগুলোকে ভালো-মন্দের বিচারে চোখ বন্ধ করে বাধাও যায় না। ‘মন্দ’ বললেও ঠিক ‘মন্দ’ও নয়, খল হলেও দর্শকদের ভাবিয়েছে, কারণ চরিত্রটিকে রূপ দিয়েছেন নানা পাটেকর।
একে একে করলেন পারিন্দা (১৯৮৯), অঙ্গার (১৯৯২), অগ্নি সাক্ষী (১৯৯৬), শক্তি (২০০২), অপহরণ (২০০৫) এর মতো সিনেমা, যেখানে তার চরিত্র ‘খল’। আবার যেসব সিনেমাতে তিনি খল চরিত্র করেননি, সেখানেও তার মাঝে লুকিয়ে থাকা রাগ বের হয়েছে। প্রহার (১৯৯১), তিরাঙ্গা (১৯৯৩), ক্রান্তিবীর (১৯৯৪), জশবন্ত (১৯৯৭), আব তাক ছাপ্পান (২০০৪) এসব সিনেমা অন্যতম।
শুধু খল নয়, কমেডি সিনেমাতেও নিজের ছাপ রাখেন নানা। ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১ ও ওয়েলকাম এই দুই সিনেমার কথা বলতেই হয়। কোনো কারণে পারিন্দা সিনেমার পর অনীল কাপুরের সঙ্গে দীর্ঘ দিন কাজ করেননি নানা পাটেকর। যার ইতি ঘটে ওয়েলকাম সিনেমায় উদয় শেট্টির চরিত্র দিয়ে, যেখানে অনীল কাপুর করেন বিখ্যাত মজনু ভাইয়ের চরিত্র। ওয়েলকাম সিনেমার অসংখ্য দৃশ্য এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মিম।

আবার ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১ সিনেমাতেও তিনি কমেডি করেন। সেই কমিক দৃশ্যগুলোতেও তাকে দেখা যায় তার স্বভাবজাত মেজাজ দেখাতে।
অভিনেতা পরিচয়ের বাইরেও নানার আরেকটি পরিচয় আছে, সেটি যোদ্ধা। ৮০ দশকের শেষের দিকে মারাঠা লাইট ইনফেন্ট্রির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেখানে তিন বছর প্রশিক্ষণ নেন এবং ১৯৯০ সালে ইন্ডিয়ান টেরিটরি আর্মির ক্যাপ্টেন পদে যুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধ শুরু হলে, নানা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা জানান। প্রথমে সেটি নাকচ করা হয়।
স্বভাবজাত মেজাজ দেখিয়ে তিনি ফোন করে বসেন ডিফেন্স মিনিস্টার জর্জ ফেরনান্দেজকে। মারাঠা লাইট ইনফেন্ট্রিতে তার তিন বছরের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতার কথা মন্ত্রীকে জানান এবং সম্মতি পান। যুদ্ধের সময় তিনি লাইন অব কন্ট্রোলের লে, বারামুল্লা, সপোরের মতো বরফাচ্ছন্ন অতিউচ্চ স্থানে ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে কাজ করেন। যুদ্ধের আগে তার ওজন ছিল ৭৬, ৬০ দিন পর হয় ৫৬।
খরা উপমহাদেশের বাস্তবতা। বিভিন্ন সময়ে বহু কৃষক করেছে আত্মহত্যা, সময়ে সময়ে নেমেছে রাস্তায়, করেছে আন্দোলন। নানা পাটেকর নিজেকে সব সময় তাদেরই একজন মনে করতেন। কৃষকদের আন্দোলন নিয়ে তিনি বরাবরই সরব ছিলেন, তাদের সমর্থন দেন, গড়ে তুলেন নাম ফাউন্ডেশন, যার মধ্যে তিনি কৃষকদের আর্থিকসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেন।
এত এত চরিত্রে অভিনয় করলেও পারিন্দা সিনেমাটি নানা পাটেকরের সিনেমা-জীবনে বিশেষ।

অন্না শেঠ চরিত্রটি দেখে বিশ্বের তথা ভারতের একজন বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক মুগ্ধ হন। সেই পরিচালক নানাকে জড়িয়ে ধরে তার অভিনয়ের প্রশংসাও করেন, যা তিনি সবাইকে করেন না। অত্যন্ত নামকরা ও প্রভাবশালী এই পরিচালক ১৯৯২ সালে মারা যান। মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত ডায়েরির সাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়, যেখানে লেখা তিনি দিলীপ কুমারের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলেন।
এক সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকর জানিয়েছিলেন, ডায়েরিতে আরেকটি কথাও ছিল ‘আই ওয়ান্ট টু ওয়ার্ক উইথ নানা পাটেকর’ ডায়েরিটি সত্যজিৎ রায়ের! যা স্বয়ং নানা পাটেকারের মতে তার জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন।
নানা পাটেকরের আসল পরিচয় আসলে কোনটি? তিনি নাট্য মঞ্চের অভিনেতা, সিনেমার অভিনেতা নাকি যোদ্ধা নাকি একজন বিপ্লবী। সবগুলোই তার পরিচয় তার ব্যক্তিত্বেরই অংশ যেমন ওয়েলকামের ‘কন্ট্রোল উদয়’ বলে বুঝিয়ে দেন যে, তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণ করছেন একইসঙ্গে ক্ষুব্ধ হয়ে ক্রান্তিবীর সিনেমায় দেখিয়ে দেন যে, এই সমাজ কত অন্যায় ও অবিচারে জর্জরিত। নানা পাটেকরের চোখের তেজ, রাগ ও তীব্রতা উপমহাদেশের লাহোর কিংবা বোম্বে অথবা ঢাকা প্রতিটি ক্ষুব্ধ নাগরিকের প্রতিফলন। এমন ‘মেজাজি’ নানা পাটেকারের আজ বিদায়!
