নগরায়ণের ধাক্কায় কুমিল্লা হারাচ্ছে খেলার মাঠ, কমছে শিশুর বিকাশের সুযোগ

দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুমিল্লা শহরে কমছে খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা। বাড়ছে বহুতল ভবন, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ। 

একসময় বাড়ির উঠোন কিংবা ভবনের সামনের ফাঁকা জায়গায় শিশুরা খেলত। এখন সেসব জায়গাও দখল করে তৈরি হচ্ছে বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। ফলে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ ও বিকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

কুমিল্লার আবাসিক এলাকা ঝাউতলার বাসিন্দা সাব্বির হোসেন সেন্টু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আশপাশের ছয়জন প্রতিবেশী তাদের বাড়ি অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে দিতে সম্মত হয়েছেন। তিনিও সেখানে তাদের ছোট বাড়ি করে দেবেন। এতে আশপাশের ছোট ছোট উঠোন ও ফাঁকা জায়গাগুলোও হারিয়ে যাবে।

শহরের ঠাকুরপাড়া, মুন্সেফবাড়ি, চর্থা, রেসকোর্স, ঝাউতলা, বাদুরতলা ও কান্দিরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা যায়। ফাঁকা জায়গায় গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। এসব ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় শিশুদের খেলাধুলার জায়গার বিষয়টা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

কুমিল্লার সাংস্কৃতিক সংগঠন শব্দার্থ সংস্কৃতি খোলা চত্বরের পরিচালক বিপ্লব সাহা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শিশু-কিশোররা তাদের একাডেমিক শিক্ষার জালে বন্দি হয়ে পড়েছে। সেখানে মানসিক বিকাশের জন্য সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ নেই। বহুতল অ্যাপার্টমেন্টে সামাজিক বন্ধন তৈরির সুযোগও কম।’ 

তিনি বলেন, ‘এ কারণে তারা ডিভাইসনির্ভর সংস্কৃতিতে আটকে যাচ্ছে। আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করব, কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পথে পরিচালনার মতো ব্যবস্থা নেই।’

বিপ্লব সাহার মতে, পাড়া-মহল্লায় আগের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমও দেখা যায় না। একই ভবনে বসবাস করেও অনেকে একে অপরকে চেনেন না। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কিশোর-কিশোরীদের ওপর।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি এসব উদ্যোগে কিশোর-কিশোরীদের সরাসরি যুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি।

একসময় স্কুল-কলেজের মাঠে সকালে বা বিকেলে খেলাধুলা করতে পারত শিশু-কিশোররা। এখন চাইলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে গিয়ে খেলার সুযোগ মেলে না।

কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার ফুটবল কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সাইফুল আলম বাবু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখন স্কুল-কলেজের মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। নিরাপত্তাসহ নানা কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মাঠে খেলাধুলার সুযোগ দিতে চায় না।’

তিনি বলেন, কুমিল্লা নগরে দু-একটি স্কুল ছাড়া অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত।

এ বিষয়ে কুমিল্লার একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক দেবরাজ ঘোষ বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধের আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ এখন মাঠের ব্যবহার সীমিত করেছে। মাঠে খেলাধুলার সময় কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও তার দায় বহন করতে হয়। এ কারণে কর্তৃপক্ষ ঝুঁকি নিতে চায় না।’

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েম আহমেদ ভূঁইয়া জানান, সিটি করপোরেশন এলাকায় দুটি পার্ক রয়েছে। একটি শহরের ধর্মসাগর পার্ক, অন্যটি তেলিকোনা পার্ক। এছাড়া জেলা প্রশাসনের ডিসি পার্ক উন্নয়নেও সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এই শহরে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও বিনোদনের চাহিদা মেটাতে এসব পার্ক কতটা যথেষ্ট, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদে মেলামেশা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগও সীমিত হচ্ছে। অন্যদিকে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় তাদের অনেকের অবসর কাটছে ভার্চুয়াল জগতে।

পড়াশোনার পাশাপাশি যে বয়সে মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথা, সেই বয়সে অনেক শিশু-কিশোর দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে স্মার্টফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের পর্দায়। এতে তাদের স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

কুমিল্লায় প্রায় ৪০ বছর ধরে শিশু-কিশোরদের চিকিৎসা করছেন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ইকবাল আনোয়ার। 

তিনি বলেন, ‘এখন পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। এ নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। শিশু-কিশোররা আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে।’

দীর্ঘদিনের চিকিৎসা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ইকবাল আনোয়ার বলেন, শিশু-কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে তার মনে হয়েছে, তাদের অনেকেই মানসিক চাপ, অজানা ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে বড় হচ্ছে। মা-বাবার ব্যস্ততা, খেলাধুলার সুযোগের অভাব ও ডিভাইসনির্ভরতা এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, ‘আগে আমরা পাড়ার পুকুরে সাঁতার কাটতাম, গাছ থেকে পানিতে ঝাঁপ দিতাম। এখন সেই পরিবেশও বদলে গেছে। খাদ্যে ভেজালসহ নানা পরিবেশগত সমস্যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলছে।’

ইকবাল আনোয়ারের মতে, শিশুদের ভয়মুক্ত ও দূষণমুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ খেলার মাঠ, উন্মুক্ত প্রকৃতি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ। 

তার কথায়, ‘শিশুদের জন্য প্রয়োজন উদার আকাশ, বিশাল সবুজ মাঠ।’

Related Articles

Latest Posts