কাজের সূত্রে সৌদি আরবের দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল হৃদয়ের। কিন্তু ফ্লাইট জটিলতায় তার যাত্রা আটকে গেছে, কবে যেতে পারবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এরমধ্যেই আগামী ১৭ অক্টোবর তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হৃদয়ের সঙ্গে কথা হয়। তিনি তখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অফিসের দিকে যাচ্ছিলেন। তার আশা ছিল, হয়তো এর সুরাহা হবে।
সৌদি আরবের দুটি ব্যস্ত বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। প্রবাসী কর্মীদের যাত্রা যেন বাতিল না হয় এবং তারা যেন চাকরি না হারান, সেজন্য বিমান সংস্থা, রিক্রুটিং এজেন্সি ও সরকারি কর্মকর্তারা মিলে তাদের জেদ্দা বা মদিনার ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা করছেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-দাম্মাম ও ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত থাকবে।
বিমানের পরামর্শ, যাদের জরুরি ভিত্তিতে সৌদি আরবে পৌঁছানো প্রয়োজন, তারা চাইলে জেদ্দা বা মদিনার ফ্লাইট ব্যবহার করতে পারেন। এজন্য তাদের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সেলস সেন্টারে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট চলাচলে সীমাবদ্ধতার কারণে এ পর্যন্ত ৬২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যার ফলে ৯ হাজার ৬৭৪ জন যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাদের একটি বড় অংশই প্রবাসী শ্রমিক।
মোহাম্মদ নাসির নামে এক যাত্রীর ভিসার মেয়াদ ২০ অক্টোবর শেষ হবে। তার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংস্থাটি ২১ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদের সব ফ্লাইট বন্ধ রেখেছে।
নাসির জানান, তিনি বিমানবন্দরে ওই এয়ারলাইনসের কাউন্টারে গিয়ে যোগাযোগ করেছিলেন। তাকে বলা হয়েছে, প্রস্তুত থাকতে—সিট খালি থাকা সাপেক্ষে তাকে অন্য কোনো ফ্লাইটে সৌদি আরব পাঠানোর চেষ্টা করা হবে।
এদিকে মোহাম্মদ রুহুল আমিনের ১১ অক্টোবর রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল। তার রিক্রুটিং এজেন্সি বিকল্প হিসেবে জেদ্দার একটি টিকিট জোগাড় করে দিয়েছে এবং গত রাতেই তার সৌদির উদ্দেশে যাওয়ার কথা ছিল।
এছাড়া, যে কর্মীরা ফ্লাইট বাতিলের কারণে আগেই আটকা পড়েছিলেন, তাদেরও এখন ভিন্ন রুটে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আরেক যাত্রী মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, তার রিক্রুটিং এজেন্সি তাকে ঢাকায় আরও দুয়েকদিন অপেক্ষা করতে বলেছে। এরই মধ্যে তারা সৌদি আরবগামী অন্য কোনো ফ্লাইটে একটি সিট খোঁজার চেষ্টা করছে।
মোহাম্মদ শাহিনের ভিসার মেয়াদ আরও কয়েক মাস আছে। তিনি পরিস্থিতির চাপে পড়ে ছুটিতে আরও এক মাস সময় বাড়িয়ে নিয়েছেন। তার ভাষ্য, প্রয়োজনে তিনি জেদ্দা বা মদিনা হয়েই সৌদি আরবে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বলছে, এভাবে বিকল্প রুটে যাত্রী পাঠানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমআরজে গ্লোবালের বেলাল হোসেন বলেন, আমরা আমাদের কর্মীদের ভিসা ও চাকরি বাঁচাতে তাদের বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা করছি। আমরা এমন অন্য এয়ারপোর্টগুলোও খুঁজছি, যেগুলো নিরাপদ এবং সচল আছে।
উদয়ন ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস এবং জিএম ওভারসিজের প্রতিনিধিরা জানান, ভিসার মেয়াদ একবার শেষ হয়ে গেলে তা নবায়ন করা খুব কঠিন। তাই তারা কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই যেন তারা তাদের নিজ নিজ এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
সরকার বলছে, কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তারা এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ফ্লাইট জটিলতায় আটকা পড়া কর্মী, বিশেষ করে যাদের ছুটি শেষ হয়ে আসছে বা ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে, তাদের নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন।
গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার সময়ও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। তখন সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল করেছিল।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকার এখন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নতুন এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিস্থিতির ওপর সরকার সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের কনস্যুলার সেবা দেওয়া এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতার মূল লক্ষ্য হলো কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের জীবিকার ঝুঁকি কমানো।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করছে।
তিনি বলেন, কর্মীদের কাউকে কাউকে যদি বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয়, তবে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার চায়, বিদেশফেরত কর্মীরা যেন যথাযথ সহায়তা পান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।
গত ১২ অক্টোবর এক নির্দেশনায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সৌদিগামী সব এয়ারলাইনসকে বলেছে, ফ্লাইট বাতিল বা সময় পরিবর্তনের খবর যেন যাত্রীদের এসএমএস, ফোন কল বা ইমেইলের মাধ্যমে দ্রুত জানানো হয়। পাশাপাশি টিকিট রিফান্ড বা নতুন ফ্লাইটের বিষয়েও যাত্রীদের পরিষ্কার ধারণা দিতে বলা হয়েছে।
এয়ারলাইনসগুলোকে আরও বলা হয়েছে, যেসব যাত্রী ভিসা বা ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন, তাদের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিতে হবে। আটকে পড়া যাত্রীদের সহায়তা করার পাশাপাশি বিমানবন্দরের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য এয়ারলাইনসগুলোকে ফোকাল পয়েন্ট নিয়োগ করতে বলা হয়েছে।
তবে ফ্লাইট বাতিল বা পরিবর্তনের খবর যাত্রীদের ব্যক্তিগতভাবে জানানো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
এই সংকটের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ওপর বাংলাদেশের যে বিশাল নির্ভরতা, সেই বিষয়টিও আবারও আলোচনায় এসেছে।
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক স্বীকার করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা জনশক্তি রপ্তানির পরিকল্পনাকে কিছুটা ধীর করে দিতে পারে।
তিনি জানান, সরকার এখন এশিয়া-প্যাসিফিক ও ইউরোপের দেশগুলোতে বিকল্প বাজারের খোঁজ করছে এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে আরও জোর দিচ্ছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, নতুন নতুন দেশে শুধু অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে সমাধান খুঁজলে হবে না।
তিনি বলেন, ‘অদক্ষ শ্রমিকের জন্য নতুন বাজার না খুঁজে আমাদের উচিত নির্দিষ্ট দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির দিকে নজর দেওয়া।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের উচিত শুধু আগামী তিন থেকে ছয় মাসের সংকট সামলানোর পরিকল্পনা না করে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যমেয়াদি প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া।
কিন্তু হৃদয় আর নাসিরের তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তারা কোনো ফ্লাইটে সিট পাবেন কি না, সেটাই এখন তাদের বড় দুশ্চিন্তা।
