যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ছয় মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ভারত সফরে আসছেন। গতকাল বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।
এই সফরে জ্বালানি ও বাণিজ্য সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ সময়ে তিনি মুম্বাই ও জামনগর ভ্রমণ করবেন।
উজবেকিস্তানের সমরখন্দে একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর ১৯ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ভারত সফর করলেও মার্কো রুবিও রাজধানী নয়াদিল্লি যাবেন না বলে দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রুবিও ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করতে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
রুবিওর জামনগর সফরটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সেখানে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ পরিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম একক তেল শোধনাগারটি অবস্থিত। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে আম্বানি পরিবারের পক্ষ থেকে তার সম্মানে বড় ধরনের সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে।
জামনগর শোধনাগারটি রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকারী শীর্ষ তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটি, যদিও বর্তমানে তারা রাশিয়ার তেল আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে এনেছে।
গত মাসে পাস হওয়া ‘স্যাংশনস এগেইনস্ট রাশিয়ান অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’(এসআরআইএ) অনুযায়ী, ভারতসহ যেসব দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে, তাদের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব আনার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে ট্রাম্পের। আর রুবিওর এই সফরের ঠিক একদিন পরেই সেই প্রস্তাব আনার কথা রয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ টেক্সাসের ব্রাউনসভিল শহরে একটি তেল শোধনাগারে বিনিয়োগ করবে। তবে এই যৌথ উদ্যোগের বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এই সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠকের কথা রয়েছে। তবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সফর নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি, এমনকি রুবিও কেন দিল্লি সফর করছেন না—সে বিষয়েও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এই বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, সফরের আলোচ্য বিষয়গুলো নিয়ে যথাযথ সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হবে।
তিনি আরও বলেন, সফর নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ‘সময়মতো জানানো হবে’। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এও নিশ্চিত করেন, এসআরআইএ আইনের বিষয়ে ভারত এরইমধ্যে তাদের উদ্বেগের কথা মার্কিন সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে।
রুবিওর এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন বিভিন্ন কারণে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্কে বেশ টানাপোড়েন চলছে। দুই দেশেরই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মন্ত্রীরা স্বীকার করেছেন যে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। এমনকি ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণও গত সপ্তাহের আলোচনাকে ‘গতিহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন।
গত সপ্তাহে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে আরও একটি বড় ধাক্কা লাগে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন পাঁচটি ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে তাদের কর্মীদের গ্রিন কার্ড বা স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতার সনদ দেওয়ার ক্ষমতা বাতিল করে।
তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে এখন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে, যেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে—এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই রুবিও এই সফরে আসছেন।
এত সব টানাপোড়েনের মধ্যেও আগামী ১৩ ডিসেম্বর ফ্লোরিডায় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠকের কথা রয়েছে। এ ছাড়া নভেম্বরে ম্যানিলায় আসিয়ান সংশ্লিষ্ট সম্মেলনের সময়ও তাদের মধ্যে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুই নেতা ফোনে কথা বলেন।
এদিকে সোমবার কলকাতায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সাংবাদিকদের ইঙ্গিত দেন, দুই দেশের মধ্যে আরও নতুন নতুন আলোচনার ঘোষণা আসছে।
তিনি বলেন, সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা জানতে চোখ রাখুন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও সর্বশেষ গত মে মাসে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লি সফরে এসেছিলেন।
ভারতে বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে অন্তত ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বেশ কয়েকদিন ধরে উত্তাল হয়ে আছে ভারতের রাজধানী।
দিল্লির যন্তর মন্তরে তরুণদের দল ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে ধরপাকড় ও সহিংসতার মধ্যেই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। এ পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের খবর সামনে এলো।
