যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি আমদানির এলসি বেড়েছে ৬৫ শতাংশ

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির জন্য খোলা ঋণপত্রের (এলসি) পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে সরকারি ভর্তুকি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির জন্য ৩৭০ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২২৮ কোটি ডলার।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অপরিশোধিত তেল আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ তিনগুণ বেড়ে প্রায় ৬৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২০ কোটি ডলারের কিছু বেশি।

একই সময়ে অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, বিশেষ করে গ্যাস আমদানির জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর খোলা এলসির পরিমাণ ১১২ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২৪০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, আমদানির পরিমাণ বাড়ছে না, তবে জ্বালানি কেনার খরচ বাড়ছে।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে, আমাদের ব্যয় বাড়ছে। জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় এ বছর ১৮০০ থেকে ২০০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগে ছিল ১২০০ থেকে ১৩০০ কোটি ডলার।

তিনি আরও বলেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা ইতোমধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে স্থবির থাকতে পারে।

এতে আরও বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধি বেসরকারি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

একমাত্র তেল আমদানিকারক রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে বলেন, এক বছর আগের তুলনায় পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তেল আমদানির জন্য আমাদের অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় দিতে হচ্ছে এবং সরবরাহকারীদের বাড়তি অর্থও দিতে হচ্ছে।

জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের বছরে ৬৮ লাখ টনের বেশি পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য প্রয়োজন হয়। এর মোট চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ডিজেল।

বিপিসির ওই কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দাম বেড়েছে। সংঘাতের আগে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে হতো। তবে আমদানির পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেড়ে ২৯৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পণ্যদর-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম আগের বছরের একই সময়ের ৬৯ ডলার থেকে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

একই সময়ে জাপানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) গড় দামও বেড়েছে। ওই প্রান্তিকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম বেড়ে ১৪ দশমিক ৪৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ১১ দশমিক ৭৩ ডলার।

বাংলাদেশ গ্যাসের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী কাতারএনার্জি ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দেয়। ফলে এলএনজি কিনতে এখন স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসের শেষ দিকে কাতারএনার্জি বাংলাদেশকে দেওয়া ফোর্স মেজরের নোটিশের মেয়াদ বাড়িয়ে নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।

এরপর স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ৩০ ডলারে এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে দামের প্রায় তিনগুণ। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।

জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল বলেন, আমদানি করা এলএনজির দাম বাড়ায় সরকারি ভর্তুকির পরিমাণও বাড়বে। কারণ, ২০২৫ সালে যতটা এলএনজি আমদানি করা হয়েছিল, এ বছরও একই পরিমাণ আমদানি করলে শুধু এলএনজি কিনতেই আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি ব্যয় হবে।

তেল আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত মাসে সরকার প্রধান চারটি পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এর মাধ্যমে বাড়তি ব্যয়ের বড় একটি অংশ ভোক্তাদের ওপর চাপানো হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কারণে ২০২২ সালের আগস্টে রেকর্ড পরিমাণ দাম সমন্বয়ের পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি।

শফিকুলের মতে, জ্বালানির দাম দীর্ঘদিন বেশি থাকলে বা বর্তমান পর্যায়ে স্থির থাকলে সরকারের পক্ষে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, রাজস্বের ওপর চাপ বাড়ায় শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ সীমিত হয়ে যেতে পারে। সরকার পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করতে না পারলে তা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক লেনদেন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। কারণ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস খুবই সীমিত। আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয় রয়েছে। এর বাইরে তেমন কোনো উৎস নেই।

‘তাই জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বাড়লে, তা দ্বিগুণ হলে বা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাড়লেও আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে স্পষ্টতই প্রভাব পড়বে। সরকারকে অতিরিক্ত ঋণও নিতে হতে পারে’, বলেন শফিকুল আলম।

এদিকে, বিপিসির ওই কর্মকর্তা বলেন, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই। ডিসেম্বর পর্যন্ত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান ডেইলি স্টারকে বলেন, আমদানি ব্যয় বাড়লে জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়তে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং টাকার মান দুর্বল হতে পারে। একইসঙ্গে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

‘এর ফলে সরকারকে উন্নয়ন ও সামাজিক খাতের ব্যয় থেকে অর্থ সরিয়ে অন্য খাতে ব্যয় করতে হতে পারে’, বলেন তিনি।

আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান এই অর্থনীতিবিদ।

বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক ডেইলি স্টারকে বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দুর্বল বিনিয়োগ, ঋণের উচ্চ ব্যয় ও জ্বালানি সংকটে আগে থেকেই চাপে থাকা অর্থনীতিতে জ্বালানির এই ধাক্কা এসেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে কমছে।

তিনি আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে, আরেকটি বহিঃস্থ ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।

Related Articles

Latest Posts