যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান: কোন দেশে, কতগুলো ও কী কারণে মোতায়েন?

সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী তিনটি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। তবে এই তিন পরাশক্তির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি দিক দিয়ে অনন্য। নিজ দেশের পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি মিত্র দেশের বিমানঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে রেখেছে ওয়াশিংটন।

বোমারু বিমানগুলো মূলত আকাশ থেকে মাটির লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালাতে সক্ষম।

কী কারণে এই কৌশল এবং কোন দেশে, কতগুলো বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, আজকের এক্সপ্লেইনারে বিষয়টি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশে বোমারু বিমান মোতায়েন করলেও তা সাময়িক। যেকোনো সময় নিজেদের প্রয়োজনে সেগুলোকে ফিরিয়ে নিতে পারে ওয়াশিংটন।

গত ৬ অক্টোবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন বলছে—বিদেশি ঘাঁটিতে বোমারু বিমান মোতায়েনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করা এবং মিত্রদের আশ্বস্ত করা। পরমাণু অস্ত্র যেমন ‘ডিটারেন্স’ বা শত্রুপক্ষকে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করে, ঠিক তেমনি মার্কিন বোমারু বিমানও একই ধরনের ভূমিকা পালন করে।

বিদেশে বোমারু বিমান পাঠানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দেখাতে চায় যে প্রয়োজন হলে তারা দ্রুত ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে সক্ষম।

গত ৪ অক্টোবর হঠাৎ করেই ইংল্যান্ডের পশ্চিমে রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে দিনভর মার্কিন বোমারু বিমান উড়ে যেতে দেখা যায়।

সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, দিন শেষ নাগাদ প্রায় এক ডজন বি-১বি বোমারু বিমান যুক্তরাজ্য ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি। যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং ইউরোপের এই ঘাঁটি থেকেই ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছিল মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো।

বিশ্লেষকদের মতে, গত ৪ অক্টোবর বোমারু বিমানগুলো ফিরিয়ে নিয়ে ফেয়ারফোর্ডের সেই ভূমিকার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এই ঘটনায় হঠাৎ করেই যেন গুরুত্ব হারাল লন্ডন থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি।

এটাই ছিল ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ভারী বোমারু বিমানের একমাত্র ঘাঁটি। ১৯৪৪ সালের ১৮ জানুয়ারিতে ওই বিমানঘাঁটির কার্যক্রম চালু হয়।

গত দুই সপ্তাহে ওই বিমানঘাঁটি-সংলগ্ন এলাকা থেকে ‘সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত সন্দেহে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা সবাই জামিনে মুক্তি পান।

গত ৫ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘হুমকি’ থাকায় বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তিনি মত দেন, এই হুমকির সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতা আছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘এ কারণে আমরা এগুলোকে সরিয়ে নিয়েছি। তবে খুব বেশি দূরে নয়।’

সাম্প্রতিক এই ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ও তাদের বোমারু বিমানের সক্ষমতা নিয়ে।

গত ৬ অক্টোবরের কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।

এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে তিন ধরনের বোমারু বিমান সক্রিয় আছে। খুব শিগগির বহরে নতুন একটি যুদ্ধবিমান যুক্ত হবে।

 বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস

এটি মার্কিন বোমারু বিমানের মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো। বর্তমানে ব্যবহৃত বি-৫২এইচ মডেলটি ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে তৈরি করা হয়। এর ডানার বিস্তার ৫৬ মিটার (১৮৫ ফুট)।

এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বোমারু বিমান এবং পারমাণবিক বোমা ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ প্রায় ৩১ টন অস্ত্র বহন করতে পারে।

বি-১বি ল্যান্সার

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি ব্যবহারে আসা বি-১বি ল্যান্সার তিনটির মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতির। এটি শব্দের গতিবেগের চেয়ে ১ দশমিক ২ গুণ গতিতে উড়তে পারে। উচ্চগতিতে ওড়ার সময় এই বোমারু বিমানের পেছনের দিকটি ভাঁজ হয়ে যায়।

এটি প্রায় ৩৪ টন প্রচলিত অস্ত্র বহন করতে পারে, যা তিন ধরনের বোমারু বিমানের মধ্যে সর্বোচ্চ।

তবে এই বিমানগুলো এখন আর পারমাণবিক অস্ত্র বহন করে না। ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি ছেড়ে যাওয়া বিমানগুলো ছিল এই মডেলের।

বি-২ স্পিরিট

বি-২ স্পিরিট হলো শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি ‘ফ্লাইং-উইং’ স্টেলথ বোমারু বিমান।

এ ধরনের ২১টি বিমান তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি দুর্ঘটনায় পড়ে ধ্বংস হয়। বর্তমানে সক্রিয় বহরে ১৯টি বি-২ রয়েছে। এটি পারমাণবিক ও প্রচলিত—দুই ধরনের অস্ত্রই বহন করতে পারে।

এর মধ্যে রয়েছে ১৩ হাজার ৬০০ কেজি (৩০ হাজার পাউন্ড) ওজনের ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা। এটি ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল।

বি-২১ রেইডার

এটি তুলনামূলক ছোট স্টেলথ বোমারু বিমান। এখনো এই বিমানটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

প্রথম বি-২১ আগামী বছর অর্থাৎ, ২০২৭ সালে এলসওয়ার্থ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর কথা।

আগামী দেড় দশকে ওয়াশিংটন বি-১বি ও বি-২-এর পরিবর্তে বি-২১ এবং আধুনিকায়ন করা বি-৫২ নিয়ে ভবিষ্যৎ বহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সব বোমারু বিমানের স্থায়ী আবাস দেশটির ৫ প্রধান বিমানঘাঁটি।

এই বিমানঘাঁটিগুলো হলো:

প্রতিটি ঘাঁটিতে দীর্ঘ ও প্রশস্ত রানওয়ে রয়েছে।

এগুলোর দৈর্ঘ্য অন্তত ১০ হাজার ফুট বা তার চেয়েও বেশি।

অর্থাৎ বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের মতোই দীর্ঘ এসব বোমারু বিমানের রানওয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বোমারু বিমান কোথা থেকে পরিচালনা করা যাবে, তা নির্ধারণে রানওয়ে নয়; বরং নিরাপত্তা, অস্ত্র সংরক্ষণ ও সহায়তা ব্যবস্থাই মূল বিষয়।

নিজ দেশের বাইরে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে পর্যায়ক্রমে বোমারু বিমান মোতায়েন করে।

যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি ঘাঁটির মধ্যে আছে গুয়ামের অ্যান্ডারসেন বিমানঘাঁটি ও ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া।

এ ছাড়াও, মার্কিন বিমানবাহিনী ‘বোম্বার টাস্ক ফোর্স’ মোতায়েনের আওতায় কয়েক সপ্তাহের জন্য মিত্র দেশগুলোর বিমানঘাঁটিতে অল্পসংখ্যক বোমারু বিমান পাঠায়।

সম্প্রতি, স্পেনের মোরনে বি-৫২, নরওয়ের অরল্যান্ড ও জাপানের মিসাওয়ায় বি-১বি ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলের টিন্ডালে বি-৫২ মোতায়েন করা হয়েছে।

টিন্ডালে বি-৫২গুলো সেপ্টেম্বর মাসে পৌঁছায়।

আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এসব বোমারু বিমান হামলা চালাতে যেতে পারে।

অনেক সময় সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বোমারু বিমানের সঙ্গী হয় জ্বালানি বহনকারী উড়োজাহাজ। আকাশপথেই বোমারু বিমানগুলোতে জ্বালানি ভরা হয়।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক হামলার সময় বোমারু বিমানগুলোর যাওয়া-আসার মিশনে ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছিল।

তিনটি করে বোমারু বিমানের একেকটি স্কোয়াড্রনের সঙ্গে হয়েছিল প্রায় ছয় থেকে নয়টি ট্যাংকার উড়োজাহাজ।

মার্কিন বিমানবাহিনীর আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য থেকে জানা যায়—যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বি-১বি, বি-২ ও বি-৫২এইচ—এই তিন ধরনের মোট ১৩৯টি বোমারু বিমান রয়েছে।

এর মধ্যে বি-১বি রয়েছে ৪৪টি, বি-২ রয়েছে ১৯টি ও বি-৫২এইচ রয়েছে ৭৬টি।

তবে এগুলো সব সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বা বিদেশে মোতায়েন থাকে না। এটা বহরে থাকা বোমারু বিমানের মোট সংখ্যা।

বি-২১ রেইডার এখনো কার্যকরভাবে মোতায়েন হয়নি, তাই এই হিসাবে তা ধরা হয়নি।

মার্কিন বোমারু বিমানগুলোর স্থায়ী ঘাঁটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে।

তবে ‘বম্বার টাস্ক ফোর্স’ কর্মসূচির আওতায় এগুলো নিয়মিতভাবে বিভিন্ন মিত্রদেশে সাময়িকভাবে মোতায়েন করা হয়।

সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—অস্ট্রেলিয়ার টিনডাল ঘাঁটিতে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে একাধিক বি-৫২ মোতায়েন করা হয়েছে; তবে ঠিক কতগুলো বোমারু বিমান সেখানে আছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।

যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ডে থাকা ১২টি বি-১বি বোমারু বিমান চলতি অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

জাপান, নরওয়ে, স্পেন, রোমানিয়া, গুয়াম ও দিয়েগো গার্সিয়ায় অতীতে বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ মুহূর্তে সঠিক সংখ্যার কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফলে, এ মুহূর্তে বিদেশের মাটিতে কতগুলো মার্কিন বোমারু বিমান রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে জানার গ্রহণযোগ্য তথ্যসূত্র নেই।

Related Articles

Latest Posts