সৌদি আরবে কীভাবে নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানছে হুতিরা?

ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতি বিদ্রোহীরা গত এক সপ্তাহে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বিশ্বের বৃহত্তম তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় প্রতিবেশী শত্রুর কাছ থেকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ঝুঁকি কতটা, তা সামনে এসেছে।

রয়টার্স বলছে, সৌদি আরব বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। এমন সময়ে এই হামলাগুলো দেশটিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

অস্ত্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় মিত্র সৌদি আরবের জন্য এমন পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে কয়েক বছরের ঘটনা ও পরিবর্তন কাজ করেছে।

তাদের মতে, একসঙ্গে কয়েকটি বিষয় হুতিদের হামলার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের সহায়তায় হুতিদের উন্নত অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারে প্রায় স্বনির্ভর হয়ে ওঠা, ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া।

আনুষ্ঠানিকভাবে আনসার আল্লাহ নামে পরিচিত হুতিদের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে ইরান। তবে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে হুতিদের অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করে আসছে তেহরান।

যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান নিজেও আর্থিক ও সামরিক চাপে রয়েছে। তারপরও দেশটির সহায়তায় হুতিরা এখন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র নিজেরাই সংযোজন করতে শিখেছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, শুরুতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং ইরানের মিত্র লেবাননের হিজবুল্লাহ সদস্যরা হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও সেগুলো পরিচালনার বিষয়ে জ্ঞান দিয়েছিলেন। ইয়েমেনের সাবেক সামরিক প্রকৌশলী এবং স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত নতুন প্রজন্মের বিশেষজ্ঞরা এসব সক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সহায়তা করেছেন।

ক্রিগের ভাষায়, ‘তেহরান শুধু হুতিদের অস্ত্র সরবরাহই করেনি, তারা এমন একটি দেশীয় সামরিক শিল্প ও প্রযুক্তি শেখার প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে, যা ভেঙে দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ইরান থেকে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহের পথ বন্ধ হয়ে গেলেও এই সক্ষমতা টিকে থাকতে পারে।’

ইরানের কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, এভাবে হুতিরা ইরানের অন্যতম কার্যকর ও কম খরচের সামরিক মিত্রে পরিণত হয়েছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হামিদ নিকু বলেন, হুতিরা সরাসরি ইরান থেকে অস্ত্র বা সরঞ্জাম না পেলেও যেন নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছিল। কারণ, এসব সরঞ্জাম জব্দ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বাহিনীও।

নিকুর ভাষ্য, এই কৌশলের অংশ হিসেবে হুতিদের এমন কিছু যন্ত্রাংশ সংযোজন করতে শেখানো হয়েছে, যেগুলো বেসামরিক ও সামরিক—দুই ধরনের কাজেই ব্যবহার করা যায়। এসব যন্ত্রাংশ দিয়ে ড্রোন, এমনকি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করা সম্ভব।

হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করে ছোড়া হুতিদের বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। পাশাপাশি হুতিদের ১২৭টি অস্ত্রের গুদাম ও উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করেছে।

জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষের সহায়তায় হুতিরা উন্নত সামরিক প্রযুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিস্ফোরক বোঝাই দ্রুতগতির নৌযান।

নিজেদের অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে হুতিদের বড় শক্তি হলো, তারা শুধু ইরানে তৈরি অস্ত্র বা ইরান থেকে আসা সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে না।

কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ নামে একটি সংস্থা চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চীন থেকে পাঠানো যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে উন্নত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে হুতিরা। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এমন একটি চালান জব্দ করার পর বিষয়টি সামনে আসে।

ক্রিগ বলেন, বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এমন যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে চীন গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, ইরান এমন বিশেষ সামরিক প্রযুক্তি, কারিগরি জ্ঞান ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে, যেগুলো সাধারণ বাণিজ্যিক বাজার থেকে সংগ্রহ করা কঠিন।

অস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়াতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের চেষ্টাও করছে হুতিরা।

গত মাসে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক জানায়, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় একটি হুমকি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী তাদের ক্লড এআই এজেন্ট ব্যবহার করে কয়েক ধরনের অস্ত্রের সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তা নিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত রকেট, ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার একটি সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক গ্লাইডেড ভেহিকলযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সংস্করণ।

হুতিরা যখন অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে এ চাপ আরও বেড়েছে। নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব মিত্রের মধ্যে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো রয়েছে। ফলে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফারজান সাবেত বলেন, সামরিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সৌদি আরব এখনো ইসরায়েল বা ইউক্রেনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই দেশটির জন্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তার মতে, সৌদি আরবের বিশাল আয়তনও প্রতিরক্ষার কাজকে কঠিন করে তুলেছে। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রক্ষার তুলনায় সৌদি আরবের পুরো ভূখণ্ডকে বিমান হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখা অনেক বেশি জটিল।

সাবেতের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় হুতিরা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা তাদের অস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করছে।

২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ চলছিল। ওই যুদ্ধে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল সৌদি-সমর্থিত বাহিনী। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলেও পরিস্থিতি ছিল নাজুক।

২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর গাজায় অভিযান শুরু হলে হুতিরা ইসরায়েল লক্ষ্য করে রকেট ছুড়তে শুরু করে। একইসঙ্গে লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজেও হামলা চালায়।

চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। তত দিনে হুতিরা নতুন সামরিক সক্ষমতা অর্জন করেছে।

সাবেত বলেন, ‘তারা বসে থাকেনি। নিজেদের সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য এনেছে। যুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রগুলোকে আরও উন্নত করার সক্ষমতাও অর্জন করেছে।’

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুতিদের হামলার কার্যকারিতা বাড়ার পেছনে শুধু উন্নত অস্ত্র নয়, বরং অস্ত্র তৈরিতে স্বনির্ভরতা, বিকল্প উৎস থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষায় চাপ—সবকিছুই ভূমিকা রাখছে।

Related Articles

Latest Posts